হারিয়ে যাওয়া পেশা
পানি-কাদার বুক চিরে স্বর্ণ খোঁজেন ইস্রাফিল
আবুল আহসান টিটু, ফকিরহাট (বাগেরহাট)
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পুকুরের পানি ঘোলা। তলার কাদা নরম, হাতড়ে খুঁজলেও কিছুই চোখে পড়ে না। চারপাশে উদ্বিগ্ন মানুষের ভিড়। কারও নাকফুল, কারও কানের দুল, আবার কারও গলার হার হারিয়েছে পানিতে। ঠিক তখন কাঁধে লোহার আঁচড়া আর অদ্ভুত আকৃতির বিশেষ ঝুড়ি ‘ঝাঁই’ নিয়ে হাজির হন ইস্রাফিল সরদার। তার কাজ একটাই-জলাশয়ের অন্ধকার তলদেশ থেকে হারানো সোনা-রুপা তুলে আনা।
বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার কাটাখালী এলাকার বেদে বহরে থাকেন ইস্রাফিল। বয়স ৫৪ বছর। প্রায় ৩৩ বছর ধরে তিনি পুকুর, ডোবা ও জলাশয়ে ডুব দিয়ে হারানো গয়না খুঁজে জীবন চালাচ্ছেন। এখানে থাকা সর্বশেষ ১৬ ঘর বেদে পরিবারের সর্দার তিনি। স্বর্ণ খোঁজাই তার মূল পেশা। কেতাবি ভাষা ‘স্বর্ণডুবুরি’ হলেও স্থানীয়ভাবে একে ‘পুকুর ঝাড়ানি’ বলে ডাকা হয়।
ইস্রাফিলের কাছ থেকে জানা গেল, পানি থেকে গয়না খুঁজে আনা সম্প্রদায়টি হচ্ছে শান্দার বেদের মধ্যে কুড়িন্দা উপগোত্রের। তিনি সেই গোত্রের লোক। হারানো সোনা-রুপার অলঙ্কার খুঁজতে মাঝেমধ্যেই ডাক পড়ে তার।
ইস্রাফিলের কাছে বাঁশের লম্বা হাতলের সঙ্গে থাকে লোহার আঁচড়া। আর বাঁশ ও প্লাস্টিকে বানানো ত্রিকোণাকৃতির এক ধরনের ঝুড়ি, যার নাম ‘ঝাঁই’। পানিতে হারানো গয়না যেখানে পড়েছে, সেই জায়গার কাদা আঁচড়া দিয়ে টেনে আনেন তিনি। পরে ঝাঁইয়ে কাদা তুলে বারবার পানিতে ধুতে থাকেন। ভাগ্য সহায় হলে কাদা সরে বেরিয়ে আসে কাঙ্ক্ষিত গয়নার ঝিলিক।
ইস্রাফিল বলেন, ‘পানিতে নিশ্চিতভাবে হারালে গয়না পাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। কিন্তু গয়নাটা আসলে কোথায় পড়েছে, সেটাই যদি ঠিক না হয়, তাহলে খুঁজে পাওয়া কঠিন।’
কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাদা ঘেঁটেও মেলে না কিছু। আবার কখনো অল্প সময়ের মধ্যেই ঝাঁইয়ের ভেতর চকচক করে ওঠে হারানো সোনার দুল বা নাকফুল। তাই তার কাছে এই পেশা অনেকটা ‘লটারির’ মতো। গয়না মিললে ভালো অঙ্কের পারিশ্রমিক, না মিললে কেবল শ্রমের সামান্য মূল্য।
তবে অনিশ্চিত আয়ে সংসার চলে না ইস্রাফিলের। তাই অন্যদিন মালা, কড়ি ও মাদুলি বিক্রি করেন তিনি। সাপ ধরারও ডাক পড়ে মাঝেমধ্যে। তার ভাষ্য, পেশা হিসাবে স্বর্ণডুবুরি। কিন্তু পুকুর-জলাশয় কমে যাওয়া এবং মানুষের জীবনধারা বদলে যাওয়ায় আগের তুলনায় কাজ নেই বললেই চলে। মাসের বেশিরভাগ সময় কর্মহীন থাকতে হয়। এ কারণে সবাই এ পেশা ছেড়ে দিয়েছে। ইস্রাফিল এ বেদে বহরের সর্বশেষ ‘স্বর্ণডুবুরি’। পূর্ব পুরুষের পেশা আঁকড়ে ধরে আছেন এক অজানা টানে।
ইস্রাফিলের স্থায়ী বাড়ি মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার খড়িয়া গ্রামে। জীবিকার টানে বছরের বিভিন্ন সময়ে তিনি বাগেরহাট, মোংলা, পিরোজপুর ও বরিশালের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন। তবে ১৮ বছর ধরে ফকিরহাটের কাটাখালী মহাসড়কের পাশের সরকারি জমির বেদে ঝুপড়িতে থাকেন।
বেদে বহরের আরেক প্রবীণ ফজল আলী আক্ষেপ করে জানান, নদ-নদী মরে গেছে, খালে পড়েছে বাঁধ। বাধ্য হয়ে তারা এখন লোকালয়ে থাকেন। স্বর্ণডুবুরির পেশা ছেড়েছেন ১০ বছর আগে।
পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কাজ করা সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরীফুল কামাল কারিম বলেন, গ্রামবাংলার জলাশয়ে হারানো অলঙ্কার উদ্ধারের এই দক্ষতা শুধু একটি জীবিকা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বেদে সম্প্রদায়ের কয়েক প্রজন্মের অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্য। জলাশয় কমার সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে সেই দক্ষতারও ব্যবহার। তাই গ্রামবাংলার পথে-ঘাটে কাঁধে আঁচড়া আর হাতে ঝাঁই নিয়ে ‘সোনা খুঁজি, রুপা খুঁজি’ হাঁক হয়তো আর বেশিদিন শোনা যাবে না।
