Logo
Logo
×
   

Advertisement

নগর-মহানগর

জনপদে আতঙ্কের ঢেউ

তুচ্ছ ঘটনায় বাড়ছে খুন-নৃশংসতা

Advertisement

আবদুল্লাহ আল মামুন

আবদুল্লাহ আল মামুন

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

তুচ্ছ ঘটনায় বাড়ছে খুন-নৃশংসতা

Advertisement

চলতি সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় বিয়ে সংক্রান্ত বিষয়ে ‘কথা কাটাকাটি’র মতো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মসজিদে যাওয়ার পথে ৬২ বছর বয়সি আবদুল মান্নানকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে মুঠোফোনে লুডু খেলার সময় ‘ভুল ধরিয়ে দেওয়া’ নিয়ে বিরোধের জেরে হত্যা করা হয় রফিক মিয়া নামে এক যুবককে। চট্টগ্রামের রাউজানে মোটরসাইকেল চুরির সন্দেহে করিম নামে একজনকে প্রকাশ্যে গুলির পর ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

রাজধানী ঢাকা থেকে জেলা শহর, বাদ যাচ্ছে না প্রত্যন্ত অঞ্চলও। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বিরোধ থেকে মুহূর্তের উত্তেজনায় ঘটছে হত্যাকাণ্ড। কখনো ধারালো অস্ত্র, আবার কখনো আগ্নেয়াস্ত্র বা লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালিয়ে মারা হচ্ছে মানুষ। তুচ্ছ ঘটনায় এসব খুন-নৃশংসতায় পরিবার ও সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে আতঙ্ক। অপরাধীদের পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বিচার নিশ্চিতের পাশাপাশি সামাজিক সহিষ্ণুতা বাড়াতে জোর দিয়েছেন অপরাধ গবেষকরা।

১৪ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে জমির রাস্তার সীমানা নিয়ে বিরোধের জেরে বড় ভাইয়ের হাঁসুয়ার কোপে খুন হয় ছোট ভাই ইমদাদুল হক বাদাল। একইদিন কুমিল্লার মুরাদনগরে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে বোন খালেদা আক্তার ও ভাতিজা মনজুরুল আলম টিটুকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। ১৩ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে পারিবারিক কলহের জেরে নও মুসলিম স্ত্রী মিম আক্তারকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে স্বামী তারিক শিকদারের বিরুদ্ধে। তুচ্ছ ঘটনায় চলতি মাসের ১৫ দিনে এমন একাধিক নৃশংস ঘটনা ঘটেছে।

অপরাধ গবেষকরা বলছেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার, স্থানীয় আধিপত্যের লড়াই, দুর্বল সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং পুলিশের প্রতিরোধমূলক সক্ষমতার ঘাটতি সহিংসতার মূল কারণ। শুধু হত্যার পর আসামি গ্রেফতার করলেই এ প্রবণতা থামানো সম্ভব নয়, এজন্য স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তি, কমিউনিটি পুলিশিং, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং দ্রুত পুলিশি হস্তক্ষেপ জরুরি।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ৭৬টি হত্যা মামলা হয়েছে। মাসভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ২৮৭, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০, মার্চে ৩১৭, এপ্রিলে ২৮৮, মে মাসে ৩১০, জুনে ৩২৬ এবং জুলাইয়ে ২৯৮টি হত্যা মামলা হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে মাসে প্রায় ২৯৬টি এবং দিনে প্রায় ১০টি হত্যা মামলা হয়েছে। হিসাবে দেখা গেছে, জুন মাসে সবচেয়ে বেশি ৩২৬টি হত্যা মামলা হয়েছে। এরপর মার্চে ৩১৭ এবং মে মাসে ৩১০টি। সবচেয়ে কম ছিল ফেব্রুয়ারিতে, ২৫০টি। প্রথম ৬ মাসের হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১ হাজার ৭৭৮টি হত্যা মামলা হয়েছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের চেয়ে ১৯৩টি বেশি। হিসাবে প্রায় ১২.২ শতাংশ হত্যা মামলা বেড়েছে। 

চলতি বছরের শুরুর ৬ মাসের অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে ৪১১টি হত্যা মামলা হয়েছে। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৬৩, রাজশাহীতে ১৮৩, খুলনায় ১৭৩, রংপুরে ১১০, সিলেটে ১০৮, ময়মনসিংহে ১০৫ এবং বরিশালে ৯৬টি। অর্থাৎ ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগেই মোট মামলার প্রায় ৪৪ শতাংশ।

পুলিশ সদর দপ্তরের মার্চ ও এপ্রিল মাসে নথিভুক্ত হওয়া হত্যাকাণ্ডের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই দুই মাসে নথিভুক্ত ৬০৫টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ৩৩৬টি ছিল পূর্বশত্রুতাজনিত, ১৪৬টি পারিবারিক বিরোধের কারণে এবং ৬৯টি সম্পত্তি ও আর্থিক বিরোধের সঙ্গে যুক্ত। আরও ১৯টি ছিল আকস্মিক হামলা, ৯টি আধিপত্য বিস্তার, ৫টি প্রেম বা পরকীয়া এবং ৬টি ডাকাতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। রাজনৈতিকভাবে সরাসরি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল ৩টি। অর্থাৎ বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ডের পেছনে ব্যক্তিগত শত্রুতা, পারিবারিক কলহ, সম্পত্তি বা অর্থনৈতিক বিরোধ কিংবা আকস্মিক সংঘর্ষের মতো বিষয় সম্পৃক্ত ছিল।

সেপ্টেম্বর মাসে সংঘটিত একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বিশ্লেষণেও প্রেম, পারিবারিক কলহ, কথা কাটাকাটির জের কিংবা সন্দেহের বশে হত্যা করা হয়েছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর সবুজবাগে ‘প্রেম’ সংক্রান্ত বিরোধের জেরে সিফাত উল্লাহ নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ৫ সেপ্টেম্বর সাভারে এক অটোরিকশাচালককে মারধর করতে দেখে ফেরাতে গেলে আলতাফ হোসেন নামে এক এসআইকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। ৪ সেপ্টেম্বর নরসিংদীর শিবপুরে পারিবারিক বিরোধে আব্দুল বাছেদ মিয়াকে (৬৫) ছুরিকাঘাতে হত্যা করে ছেলে শাকিল। ১ সেপ্টেম্বর নড়াইল সদর উপজেলায় টিউবওয়েলের পানি প্রতিবেশীর বাড়িতে পড়া নিয়ে বিরোধ থেকে সাইফুল বিশ্বাস (৭০) নামে এক বৃদ্ধ পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ১ সেপ্টেম্বর বগুড়া সদর উপজেলার বারপুর এলাকায় চোর সন্দেহে রাতভর মারধর ও নির্যাতনের পর পায়ের রগ কেটে হত্যা করা হয় শামীম হোসেন (৩৫) নামে এক যুবককে। একইদিন বরগুনার পাথরঘাটায় পারিবারিক বিরোধে দেবরের ছেলের হাতে খুন হন পিয়ারা বেগম (৬২) নামে এক নারী। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, সমাজ ও অপরাধ গবেষক ড. তৌহিদুল হক যুগান্তরকে বলেন, অপরাধী পার পেয়ে যায় এমন সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে দ্রুতবিচার নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক সহিষ্ণুতা বাড়ানোয় জোর দিতে হবে।


Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম