মেয়াদের বাকি এক মাস
রাকসুর প্রতিশ্রুতি বিস্তর বাস্তবায়ন সামান্য
Advertisement
ইরফানুর রহমান, রাবি
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
১২ মাসে ২৪ সংস্কারের অঙ্গীকার করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) নির্বাচনে জিতেছিল ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’। ৩৫ বছর পর ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে ২৩ পদের মধ্যে সহ-সভাপতি (ভিপি), সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদসহ ২০টিতে জেতে প্যানেলটি। তবে তারা ১ বছর মেয়াদের ১১ মাসেও সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেনি।
প্যানেলটির ইশতেহার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৪ দফার মধ্যে কিছু কাজ হয়েছে, কিছু বর্তমানে চলমান। আবার অনেক কাজ শুরুই হয়নি। রাকসু নেতাদের দাবি, ইশতেহারের ৬৭ শতাংশ কাজ তারা বাস্তবায়ন করেছেন। ৩৩ শতাংশ কাজ শুরু হয়নি। তবে শিক্ষার্থীদের দাবি, প্রতিশ্রুতি বিস্তর হলেও সেই অনুযায়ী দৃশ্যমান কাজ নেই, বাস্তবায়ন সামান্য হয়েছে।
কতটা বাস্তবায়ন হলো : ইশতেহারের প্রথম দফা ছিল ‘জুলাইয়ের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন’। এর পাঁচটি উপ-ধারা হলো জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িতদের বিচার, জুলাই জাদুঘর স্থাপন, ১৬ জুলাই ‘সন্ত্রাস প্রতিরোধ দিবস ঘোষণা’, সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ এবং রাকসু নির্বাচনকে একাডেমিক ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত করা। যার একটিও বাস্তবায়িত হয়নি। কেবল রাকসুকে একাডেমিক ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্তির আলোচনা হয়েছে।
দুই নম্বরে ছিল ‘মানসম্মত খাবারের নিশ্চয়তা’। তবে শিক্ষার্থীদের দাবি, পরিস্থিতি আগের মতোই আছে। দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
আবাসিকতার রোডম্যাপ প্রণয়ন, অন ক্যাম্পাস জব চালু, অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের আবাসন ভর্তুকি ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতিও ছিল তাদের ইশতেহারে। এর মধ্যে স্বতন্ত্রভাবে জয়ী জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার ব্যক্তিগত উদ্যোগে ২০ শিক্ষার্থীকে অনাবাসিক সুবিধা চালুর ঘোষণা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। বাকিগুলো এখনো হয়নি।
তবে স্নাতকোত্তরের থিসিস শিক্ষার্থীদের আর্থিক প্রণোদনা বাস্তবায়ন হয়েছে। এ ছাড়া রিসার্চ ও ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য নিয়মিত কর্মশালার আয়োজনসহ কিছু বিষয়ে কাজ হলেও পুরোপুরি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি।
এআই টুলস, জার্নাল, মাইক্রোসফট ৩৬৫ ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা সাবস্ক্রিপশন ফ্রি করার উদ্যোগ গ্রহণের কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। লাইব্রেরি ও সেমিনার লাইব্রেরিতে প্রয়োজনীয় বই যুক্ত করা এবং ডিজিটাল অ্যাক্সেসের ব্যবস্থা হয়নি।
প্যানেলটির ইশতেহারের ছয় নম্বরে ছিল ‘শিক্ষা কারিকুলাম আন্তর্জাতিকরণ’। এর চারটি উপ-ধারা নিয়ে দৃশ্যমান কোনো কাজ হয়নি।
প্রশাসনিক কাজ ডিজিটাল করা, চিকিৎসাকেন্দ্র আধুনিকায়ন, ওয়ান অ্যাপ অল সলিউশন (এক অ্যাপে সব সুবিধা), লিগ্যাল ডেস্ক চালুর প্রতিশ্রুতি থাকলেও কাজ হয়নি। তবে হল উন্নয়নের ৫০ টাকা ফি বাতিল হয়েছে। ইবলিশ চত্বরে ফার্মেসি হয়েছে এবং নিবন্ধিত ক্লাবগুলোর ব্যবহারে অডিটোরিয়াম ভাড়া কমানোর আবেদন করা হয়েছে।
ক্যাম্পাসে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সেবা চালুর অঙ্গীকার থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। রাকসু সূত্র বলছে, উচ্চগতির ইন্টারনেটের জন্য সার্ভে করা হয়েছে। শিগগিরই কাজ শুরু হবে।
নারীদের নিরাপত্তায় হেল্পলাইন চালু, বুলিং ও যৌন হয়রানি বন্ধে সিকিউরিটি সেল গঠন ও ছাত্রী হল পাড়ায় সুপারশপ চালুর প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবায়ন হয়নি। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে নানা প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়িত হয়নি।
এ ছাড়া নিরাপদ ক্যাম্পাস, পরিবহণ ব্যবস্থা সহজীকরণ, তথ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, হাইজেনিক স্যানিটাইজেশন, পূর্ণাঙ্গ টিএসসিসি বাস্তবায়ন, সাহিত্য-প্রকাশনা ও সামাজিক সংগঠনসহ নানা বিষয়ে অঙ্গীকার করলেও এখনো বেশিরভাগই ‘অধরা’।
কার্যক্রম নিয়ে হতাশা : রাকসুর কার্যক্রম নিয়ে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, ‘রাকসুর নেতৃত্বে গিয়ে নেতারা পেশিশক্তি ব্যবহার করেছেন। কখনো শিক্ষার্থীদের পেটানো, ডিনদের জোর করে পদত্যাগ, হুমকি, অযাচিত মন্তব্য করেছেন তারা। শিক্ষার্থীদের সফট কর্নার পেয়ে তারা দলীয় অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছেন।’
বাংলার শিক্ষার্থী মাইনুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল সেই অনুযায়ী দৃশ্যমান কাজ দেখতে পাচ্ছি না। রাকসু নিয়ে যে আগ্রহ ছিল সেটা শিক্ষার্থীদের অনেককে হতাশ করেছে। কিছু কার্যক্রম ছাড়া রাকসু মোটা দাগে ব্যর্থ হয়েছে।
ওই নির্বাচনের ছাত্রদল-সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম’ প্যানেলের ভিপিপ্রার্থী শেখ নূর উদ্দিন আবির বলেন, রাকসুর কর্মকাণ্ড আশাহত করেছে। প্রতিশ্রুতির বেশিরভাগই ছিল অতিরঞ্জিত। সেগুলো বাস্তবায়নে তারা চেষ্টা করেননি। রাকসু নেতারা এখতিয়ারবহির্ভূত ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ফারজানা তন্বী বলেন, রাকসু কিছু কিছু প্রোগ্রাম করেছে। তবে সেগুলো শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসাবে করার কথা না। তারা একটা বিশেষ দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করেছেন। শিক্ষার্থীদের মূল সমস্যাগুলো তারা সমাধান করতে পারেননি, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের হতাশ করেছে।
রাকসু সম্পাদকদের ভাষ্য : তাদের দাবি, আবাসিক হলগুলোতে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা এবং ৫০ টাকা আবশ্যিক ফি বাতিল করা হয়েছে। শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জোরদারে কমিউনিটি পুলিশিং চালু, সিসি ক্যামেরা ও পর্যাপ্ত লাইট স্থাপন করা হয়েছে।
নারীদের জন্য ক্যাফেটেরিয়ায় পৃথক কর্নার, ছাত্রী জিমনেসিয়াম চালু ও কেন্দ্রীয় মসজিদে নারীদের পৃথক নামাজের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। মাতৃত্বকালীন ছুটির অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। মেডিকেল সেন্টারে গাইনি চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ডাইনিং, ক্যানটিন ও ক্যাফেটেরিয়াসহ ক্যাম্পাসের খাবারের দোকানগুলো নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে।
যা বলছেন ভিসি-জিএস-এজিএস: রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, হল সংসদ প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করেছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সংসদ ইশতেহারের ৬৭ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করেছে। এখন বাকি ৪০ দিনে খাবারের মান, মেডিকেল সেন্টার এবং অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের ইস্যু নিয়ে কাজ করব।
রাকসুর এজিএস এসএম সালমান সাব্বির বলেন, অনেক কাজ চলমান। আশা করছি, মেয়াদের মধ্যে সেগুলো দৃশ্যমান হবে। ইশতেহারের বেশকিছু বিষয়ে আমরা হাত দিতে পারিনি। কিছু কিছু ইশতেহার রয়েছে, যেগুলো আসলে এক বছরে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তবে আমরা চাই, সেই কাজগুলো অন্তত শুরু করে দিয়ে যেতে।
রাকসুর জিএস আম্মার বলেন, আমার ইশতেহারের কোনোটিই অকল্পনীয় ছিল না, প্রশাসনের কাছ থেকে দাবি আদায় করে নেওয়াই ছিল লক্ষ্য। আবাসিকতার রোডম্যাপ নিয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যান, সচিব ও শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। নিরাপত্তায় ১ হাজার সিসিটিভির বাজেটের মধ্যে প্রায় ২৫০টি বসানো হয়েছে। কুইক রেসপন্স টিমের প্রস্তাব সর্বশেষ সিন্ডিকেট সভায় অনুমোদন পেয়েছে, এখন নীতিমালা প্রণয়নের অপেক্ষা। ২৩ কোটি টাকার বাজেটে পাঁচতলা মেডিকেল সেন্টার আসছে।
হল ডাইনিং নিয়ে রাকসু জিএস জানান, রাকসুর বাজেট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে প্রতি হলে ১ লাখ টাকা দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।
