ঠাকুরগাঁওয়ে অর্গানিক চা চাষ
পতিত জমি থেকে সবুজ বিপ্লব
Advertisement
এটিএম সামসুজ্জোহা, ঠাকুরগাঁও
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একসময় যে পতিত জমিগুলো কেবল গোচারণ কিংবা অবহেলায় পড়ে থাকত, আজ সেখানে বাতাসে দুলছে চায়ের সবুজ পাতার সমারোহ। ভারতের সীমান্তঘেঁষা উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে চা চাষের হাত ধরে শুরু হয়েছে এক নীরব অর্থনৈতিক বিপ্লব। আর সেই বিপ্লবের অন্যতম পথিকৃৎ অর্গানিক চা চাষ। রাসায়নিক সারের ব্যবহার ছাড়াই উৎপাদিত এই চা কেবল পরিবেশবান্ধবই নয়, বরং স্থানীয় অর্থনীতিতেও রাখছে অনন্য ভূমিকা। ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাজেদুল ইসলাম বলেন, সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত চা ঠাকুরগাঁওয়ের চা-শিল্পে এক নতুন স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করেছে। বালিয়াডাঙ্গীর ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের শতভাগ অর্গানিক চা চাষ এই বিপ্লবের অন্যতম পথিকৃৎ। তাদের ২৫ একরের সুবিশাল চা বাগানে পরিবেশবান্ধব উপায়ে উৎপাদিত চা পাতার গুণগত মানও চমৎকার। সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়ার ফিল্ড অফিসার জুয়েল রানা জানান, এই অর্গানিক বাগানে নারী-পুরুষ মিলিয়ে ৩০০ শ্রমিক নিয়মিত কাজ করছেন। কাজ পেয়ে জীবনযাত্রার মান বদলে গেছে স্থানীয় নারী শ্রমিকদের।
বাগানটির শ্রমিক নাজেরা বেগম, দিনোবালা ও ফাতেমা বেগম জানান, আগে যেখানে কাজের তীব্র সংকট ছিল, এখন তারা দৈনিক ১৮০ থেকে ২০০ টাকা আয় করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। আগাছা তুলতে তুলতে দিনোবালা সগর্বে বলেন, ‘চা বাগান হামার মতো অনেক মানুষের কামাইয়ের রাস্তা দেখাইছে। চা বোর্ডের নিবন্ধিত তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে ঠাকুরগাঁওয়ে ৬৫৮ জন চাষি বাণিজ্যিকভাবে চা চাষের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। জেলার বালিয়াডাঙ্গী, রানীশংকৈল, পীরগঞ্জ এবং হরিপুরে ৫৯০ একর জমিতে চা চাষাবাদ হচ্ছে। বালিয়াডাঙ্গীর ভান্ডারদহ গ্রামের শিক্ষক শহিদুল ইসলাম ১৬ শতক জমিতে চা চাষ করে প্রতি ৪০ দিন পরপর ২০০ কেজির বেশি পাতা সংগ্রহ করছেন। বছরের ৭ মাসেই তার আয় হচ্ছে প্রায় ২৮ হাজার টাকা। একইভাবে মরিচপাড়ার জগদীশ রায় ও পাটিয়াডাঙ্গী গ্রামের আহসান উল্লাহ মেহেদির মতো ক্ষুদ্র চাষিরাও আজ আলোর মুখ দেখেছেন। চা কারখানার মালিকরা আগে ইচ্ছামতো দামে চা ক্রয় করলেও বর্তমানে ন্যায্যমূল্য পাওয়ায় চাষিদের আগ্রহ দিনদিন বাড়ছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে চা চাষের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্গানিক চাষ পদ্ধতি আমাদের কৃষিকে আরও এগিয়ে নিচ্ছে। সীমান্তের এই জনপদে সবুজ চা পাতার ঘ্রাণে আজ কেবল ফসলের মাঠ নয়, হাসছে শত শত প্রান্তিক মানুষের স্বপ্নময় জীবন। চা বোর্ড পঞ্চগড় আঞ্চলিক কার্যালয়ের ইনচার্জ কৃষিবিদ আমির হোসেন জানান, ঠাকুরগাঁওয়ের মাটি চা চাষের জন্য সিলেটের চেয়েও বেশি উপযোগী। এখানে সাধারণত দ্রুত বর্ধনশীল ভারতের জাতের ভ্যারাইটি বিটি-২, টিভি-২৩ এবং টিভি-২৪ চাষ হয়। তবে সিলেট অঞ্চলের মতো হাত দিয়ে পাতা না তুলে ঠাকুরগাঁওয়ে ধান কাটার কাস্তে ব্যবহার করায় নতুন কুঁড়ি আসতে সময় লাগে, যা কিছুটা উৎপাদন ব্যাহত করছে।
