জামায়াতের চার এমপির লিখিত অভিযোগ
শাহজালাল বিমানবন্দরে যাত্রী ভোগান্তি চরমে
তিন ঘণ্টায়ও মেলেনি লাগেজ ট্রলি-জমজমের পানি নিয়ে হুলুস্থুল * নির্বাহী পরিচালকের সঙ্গে জামায়াত নেতার বাগবিতণ্ডা * বিমানের গ্রাউন্ড সার্ভিসের ২ কর্মকর্তাকে অব্যাহতি
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি যেন থামছেই না। ইমিগ্রেশন থেকে লাগেজ সংগ্রহ-প্রায় প্রতিটি ধাপেই দীর্ঘ অপেক্ষা, ধীরগতি ও অব্যবস্থাপনার চিত্র। সাধারণ যাত্রী থেকে ভিআইপি-সিআইপি যাত্রীদেরও নানা হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। বলতে গেলে বিমানবন্দরের ভেতরে-বাইরে কোথাও স্বস্তি পাচ্ছেন না যাত্রীরা। বৃহস্পতিবার মদিনা থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেও লাগেজ পাননি অনেক যাত্রী। ছিল না পর্যাপ্ত ট্রলি। গায়েব হয়ে যায় যাত্রীদের জমজমের পানি। এসব অনিয়মকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এসএম রাগীব সামাদ ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের মধ্যে তীব্র বাগ্বিতণ্ডা হয়। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবার মান নিয়ে দীর্ঘদিন বিভিন্ন এয়ারলাইন্স ও যাত্রীদের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সমন্বয়হীনতার কারণে প্রায়ই যাত্রী হয়রানির চিত্র সামনে আসে। যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে যাত্রী ভোগান্তি বাড়বে। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, শাহজালাল বিমানবন্দরে যাত্রী ভোগান্তির অন্যতম কারণ বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা। একই সঙ্গে ট্রলি ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্ব পালনে কর্মীদের গাফিলতিও পরিস্থিতি জটিল করছে। সম্প্রতি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তিনি বলেন, যাত্রীসেবায় কোনো ধরনের অবহেলা গ্রহণযোগ্য নয়। দ্রুত তদন্ত করে কারা দায়িত্বে গাফিলতি করছেন এবং কার কারণে যাত্রী হয়রানির ঘটনা ঘটছে, তা চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। বিমানের গ্রাহকসেবা পরিচালক বদরুল হাসান লিটন যুগান্তরকে বলেন, আমরা দ্রুত সমস্যার সমাধানে কাজ করেছি। যাত্রীদের জমজমের পানি পরবর্তী সময়ে প্রত্যেকের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। যাদের গাফিলতি ছিল বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তদন্তে আরও কারও গাফিলতির তথ্য পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে মদিনা থেকে বিজি৩৩৮ ফ্লাইটটি ঢাকায় অবতরণ করে। এরপর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও ফ্লাইটটির অনেক যাত্রী তাদের ট্যাগযুক্ত লাগেজ পাননি। বিষয়টি নিয়ে শেরপুর-১ আসনের মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদ, ঢাকা-৫ আসনের মোহাম্মদ কামাল হোসেন, গাজীপুর-৪ আসনের সালাহউদ্দীন আইউবী ও খুলনা-২ আসনের জাহাঙ্গীর হুসাইন-এই চার সংসদ-সদস্য বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে বলা হয়, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও যাত্রীরা লাগেজ পাননি। লাগেজ না পাওয়ার বিষয়ে যথাযথ কারণও জানানো হয়নি। এতে যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন এবং তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। বিমানবন্দরের নিজস্ব নির্দেশনায়ও লাগেজসংক্রান্ত সমস্যায় এয়ারলাইন্সের সংশ্লিষ্ট লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড বিভাগে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
শুধু লাগেজ নয়, ট্রলি নিয়েও চরম অব্যবস্থাপনার অভিযোগ করেন যাত্রীরা। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয় জমজমের পানি না পাওয়ার ঘটনায়। ওমরাহ শেষে ফেরত আসা যাত্রীদের জমজমের পানির কনটেইনার ফ্লাইটে আপলোড করা হয়নি। কনটেইনারটি নির্ধারিত স্থানে পড়ে থাকলেও সংশ্লিষ্ট গ্রাউন্ড সার্ভিস কর্মীরা সেটি খেয়াল করেননি। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে তা সংশ্লিষ্টদের নজরে আসে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ হন মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তাকে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে উদ্দেশ করে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলতে দেখা যায়। একপর্যায়ে যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে ‘ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার’ কথাও বলতে শোনা যায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান বলেন, ‘মদিনা থেকে বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে এসেছি। বিমানে উঠেই দেখি প্রায় অর্ধেক আসন খালি। ফার্স্ট ক্লাসের আসনও খালি ছিল, অথচ অনেক যাত্রী টিকিট পাচ্ছেন না। অনেক যাত্রী লাগেজ পাননি। ফ্লাইট থেকে নেমে ট্রলিও পাওয়া যায়নি। সার্বিকভাবে বিমানবন্দরে যাত্রীসেবায় ধীরগতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। নির্বাহী পরিচালক এসে কোনো সমাধান দিতে পারছেন না। যাত্রীদের এমন ভোগান্তি দেখে আমি একটু শাউট করেছি। সূত্রমতে, জমজমের পানি নিয়ে সৃষ্ট ঘটনার সময় দায়িত্বে ছিলেন বিমানের জুনিয়র গ্রাউন্ড সার্ভিস অফিসার মো. শাখাওয়াত হোসাইন খান (পি-৩৬৬৬৭), গ্রাউন্ড সার্ভিস অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার মনিরুজ্জামান প্রধান এবং গ্রাউন্ড সার্ভিস অফিসার সাদ্দাম। ঘটনার পর তাৎক্ষণিকভাবে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার মনিরুজ্জামান প্রধান ও গ্রাউন্ড সার্ভিস অফিসার সাদ্দামকে অব্যাহতি দেওয়া হলেও শাখাওয়াত হোসাইন খান অধরা। অথচ ব্যাগেজ এরিয়ার কন্ট্রোলারের দায়িত্ব ছিল শাখাওয়াত হোসাইন খানের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘটনার সঙ্গে শাখাওয়াতের সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ, দায়িত্বে থাকা কনটেইনার সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলেন, সব কনটেইনার অফলোড করা হয়েছে। পরে একটি কনটেইনার নিচে পড়ে থাকার বিষয়টি নজরে আসে। ফলে ওই কনটেইনার কীভাবে দায়িত্বপ্রাপ্তদের নজর এড়িয়ে গেল এবং এ বিষয়ে শাখাওয়াতের দেওয়া তথ্য কতটা সঠিক ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সূত্র আরও জানায়, শাখাওয়াত বিমানের শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক। এর আগেও তার বিরুদ্ধে যাত্রী হয়রানি, দায়িত্বে অবহেলাসহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছিল বলে জানা গেছে। বিমানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, বিমানবন্দরে প্রায়ই যাত্রী হয়রানির ঘটনা ঘটে। কিন্তু এসব ঘটনায় যারা সরাসরি জড়িত কিংবা যাদের গাফিলতির কারণে ঘটনা ঘটে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে অনেক সময় হেলপার ও সাধারণ কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এতে মূল সমস্যার সমাধান হয় না, বরং ঘটনার গোড়ায় যারা দায়ী, তারা আড়ালেই থেকে যায়। এদিকে বিমানবন্দরের ব্যাগেজ এলাকায় নিরাপত্তা বিভাগের পাঁচজন কর্মী দায়িত্ব পালন করেন। ঘটনার দিন ৮ নম্বর বেল্টে মদিনা থেকে আসা যাত্রীদের লাগেজ ওঠে। সেখানে দায়িত্বে ছিলেন নিরাপত্তা বিভাগের দুজন কর্মী। একটি কনটেইনারে লাগেজ পড়ে থাকার ঘটনা তাদের নজর এড়ানোয় দায়িত্ব পালনে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিমানের নিরাপত্তা বিভাগের ডিজিএম ফারহান তানভীর বলেন, ‘আমরা নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকি। হিসাবকিতাব মেলানো আমাদের কর্মীদের কাজ নয়।’
