জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনে লক্ষ্যের পেছনে দেশ
এক বছরের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন ৪৩, মৃত্যু নিবন্ধন ৫৬ শতাংশ
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস আজ। প্রতিবছর ৬ অক্টোবর দিবসটি পালিত হলেও সময়মতো জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনে এখনো কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি বাংলাদেশ। বরং চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে জন্মের এক বছরের মধ্যে নিবন্ধনের হার আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। মৃত্যু নিবন্ধনের হারও কিছুটা কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নিবন্ধন কার্যক্রম আরও জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘নির্ভুল নিবন্ধন, নিশ্চিত হবে সুশাসন’। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত জন্মের এক বছরের মধ্যে জন্ম নিবন্ধনের হার ছিল ৪৩ শতাংশ। একই সময়ে মৃত্যুর এক বছরের মধ্যে মৃত্যু নিবন্ধনের হার ছিল ৫৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে এ হার ছিল যথাক্রমে ৬৩ ও ৫৯ শতাংশ। অর্থাৎ চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে জন্ম নিবন্ধনের হার ২০ শতাংশীয় পয়েন্ট এবং মৃত্যু নিবন্ধন ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে।
এর আগে ২০২৪ সালে এক বছরের মধ্যে জন্ম নিবন্ধনের হার ছিল ৪৯ শতাংশ এবং মৃত্যু নিবন্ধনের হার ৪৭ শতাংশ। ২০২৫ সালে উভয় ক্ষেত্রেই অগ্রগতি হলেও চলতি বছরের প্রথমার্ধে সেই ধারা অব্যাহত থাকেনি।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এবং এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সিভিল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস (সিআরভিএস) আঞ্চলিক কর্মপরিকল্পনার আওতায় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য রয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে সময়মতো নিবন্ধন নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
আইনে ৪৫ দিন : জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন-২০০৪ অনুযায়ী শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে জন্মসংক্রান্ত তথ্য নিবন্ধকের কাছে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একইভাবে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর ৪৫ দিনের মধ্যে মৃত্যুর তথ্যও নিবন্ধকের কাছে দিতে হয়। তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে।
জন্ম নিবন্ধন একজন মানুষের আইনগত পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ বিভিন্ন নাগরিকসেবা গ্রহণে এটি গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে উত্তরাধিকার, বিমা, জমিজমাসহ বিভিন্ন আইনগত ও প্রশাসনিক কাজে মৃত্যু নিবন্ধন প্রয়োজন। দেশের জনসংখ্যা, জন্মহার, মৃত্যুহার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্যও এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
কমল কেন : নিবন্ধনের হার কমার বিষয়টি সরকারের নজরে এসেছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব (সিভিল রেজিস্ট্রেশন ও সামাজিক নিরাপত্তা অধিশাখা) মুর্শিদা শারমিন সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেছেন, নিবন্ধনের হার কমার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তবে নির্দিষ্ট কোনো কারণ এখনই চূড়ান্তভাবে বলা সম্ভব নয়।
কার্যক্রম জোরদার করতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জেলা, উপজেলা ও অন্যান্য পর্যায়ে গঠিত জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন টাস্কফোর্সকে আরও সক্রিয় করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সংশোধনের চাপ : রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের দৈনিক হিসাব অনুযায়ী, ১৪ জুন এক দিনেই জন্ম নিবন্ধনের আবেদন জমা পড়ে ৩৩ হাজার ৭৬৪টি। নিবন্ধন সম্পন্ন হয় ২৯ হাজার ৩০২টি। একই দিনে জন্ম নিবন্ধনের তথ্য সংশোধনের আবেদন ছিল ২৫ হাজার ৯৯১টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয় ২৩ হাজার ৫৬৯টি। মৃত্যু নিবন্ধনের আবেদন ছিল ৩ হাজার ৬৩৯টি এবং নিবন্ধন সম্পন্ন হয় ৩ হাজার ৩৯৪টি।
ভুয়া নিবন্ধনও সমস্যা : নির্ভুল তথ্যভাণ্ডার তৈরির পথে ভুয়া ও একাধিক জন্ম নিবন্ধনও বড় সমস্যা। চলতি বছরের মে মাসে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় থেকে এক ব্যক্তির একাধিক জন্ম নিবন্ধন করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ উল্লেখ করে সতর্ক করা হয়। সঠিক তথ্য দিয়ে নিবন্ধনের পাশাপাশি ভুয়া বা একাধিক নিবন্ধন তৈরি ও ব্যবহার থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।
প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে সেবা : বর্তমানে বার্থ অ্যান্ড ডেথ রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (বিডিআরআইএস)-এর মাধ্যমে অনলাইনে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের কার্যক্রম চলছে। আবেদন, তথ্য সংশোধন, সনদ পুনর্মুদ্রণ ও আবেদন পরিস্থিতি যাচাইসহ বিভিন্ন সেবা অনলাইনে নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
হাসপাতালে নিবন্ধনের প্রস্তাব : নিবন্ধনের আওতা বাড়াতে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব এসেছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে এক কর্মশালায় বিশেষজ্ঞরা বলেন, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে আইনগতভাবে নিবন্ধনের দায়িত্ব দেওয়া হলে সময়মতো নিবন্ধনের হার দ্রুত বাড়ানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন ও প্রযুক্তির পাশাপাশি পর্যাপ্ত জনবল, নিবন্ধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা এবং স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে।
আগে ৬ অক্টোবর ‘জাতীয় জন্ম নিবন্ধন দিবস’ পালিত হতো। ২০২১ সালের ৯ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে দিনটিকে ‘জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস’ হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর থেকে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হচ্ছে।

