কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের বেহাল অবস্থা
সংস্কারেও মিলছে না সুফল নেপথ্যে পাথরবাহী ট্রাক
ধারণক্ষমতার তিনগুণ ওজন বহন * ২০ বছর ধরে ভোগান্তিতে চলাচলকারীরা
Advertisement
আবুল খায়ের, কুমিল্লা
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়ক বারবার সংস্কার করেও কোনো কাজে আসছে না। সড়কটি সংস্কারের একমাসের মধ্যেই বিধ্বস্ত হয়ে পূর্বাবস্থায় ফিরে যাচ্ছে। ২০ বছর ধরে নিয়মিত সংস্কার করা হলেও ভারী যানবাহনের চাপে বিশেষ করে পাথরবাহী ট্রাকের অবাধ চলাচলে সড়কটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সড়ক বিভাগের নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে ট্রাকগুলো ধারণক্ষমতার তিনগুণ ওজনের অতিরিক্ত পাথর বহন করায় মহাসড়কে খানাখন্দের সৃষ্টি হচ্ছে। এ কারণে চলাচলকারীদের ভোগান্তি লাঘব হচ্ছে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিলেট থেকে চট্টগ্রামগামী পাথরবাহী সব হেভিওয়েট ট্রাক কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কটি ব্যবহার করে থাকে। সড়কটিতে কোনোরকম ওজন নিয়ন্ত্রণ স্কেল (ওয়েট স্কেল) না থাকার সুযোগে ধারণক্ষমতার তিনগুণ পর্যন্ত অতিরিক্ত ওজন নিয়ে ভারী পাথর ও বালুবাহী ট্রাক অবাধে চলাচল করে। ফলে মেরামতের পর কিছুদিন যেতে না যেতেই সড়ক দেবে এবং পিচ উঠে বড়-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়। এতে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। স্থানীয়রা জানায়, সিলেট ও ভারতের আসাম অঞ্চল থেকে আসা ভারী ড্রাম ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানগুলো নির্ধারিত সীমার তোয়াক্কা না করে প্রতিনিয়ত চলাচল করছে। সরকারি এক্সেল লোড নীতিমালা অনুসারে-একটি ৩-এক্সেল বিশিষ্ট ট্রাকের ক্ষেত্রে গাড়ি ও পণ্যসহ সর্বমোট বৈধ ওজন সীমা ৩০ টন (সামনের এক্সেল ৫ টন, দ্বিতীয় এক্সেল ১৭ টন ও তৃতীয় এক্সেল ৮ টন)। তবে বাস্তবে একেকটি ট্রাকে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত অতিরিক্ত পণ্য বোঝাই করা হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মতো কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কে কোনো কার্যকর ওয়েট স্কেল না থাকায় চালক ও পরিবহণ মালিকরা অনায়াসেই ওভারলোডিং চালিয়ে যাচ্ছেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পুরো সড়ক যোগাযোগব্যবস্থায়।
সড়ক বিভাগ জানায়, কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের অধিকাংশ অংশের মাটির নিচের লেয়ার অত্যন্ত দুর্বল। সড়কটিতে ২০ টনের বেশি ওজন বহন করার সক্ষমতা নেই। কিন্তু এ সড়কে প্রায় ৬০-৭০ টন ওজনের পাথরবাহী ট্রাক চলাচল করছে। এতে সড়কটির সংস্কার ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। কুমিল্লা সড়ক বিভাগের ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে ৪০ কিলোমিটার অংশে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহণ আইন অনুযায়ী, নির্ধারিত সীমার চেয়ে অতিরিক্ত ওজন বহন করা দণ্ডনীয় অপরাধ। শাস্তি সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বা ১ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড। কিন্তু নজরদারি ও কঠোর ব্যবস্থার অভাবে আইনের প্রয়োগ কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। বর্তমানে মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ চলমান থাকলেও কাজের ধীরগতি এবং বিভিন্নস্থানে অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়িতে জনভোগান্তি বহুগুণে বেড়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবহণচালকদের দাবি-চার লেনের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার পাশাপাশি অবিলম্বে মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে ওয়েট স্কেল স্থাপন ও কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে সংস্কার করলেও কোনো সুফল মিলবে না।
যাত্রীবাহী ফারজানা পরিবহণের পরিচালক আল আমিন বলেন, সিলেট থেকে চট্টগ্রামগামী ট্রাকগুলো তিনগুণের বেশি ওজনের পাথর বহন করছে। এতে সড়কটি সংস্কারের কয়েকদিনের মধ্যেই দেবে খানাখন্দের সৃষ্টি হচ্ছে। কুমিল্লার সুগন্ধা পরিবহণের পরিচালক বিপ্লব হোসেন বলেন, ২০ বছর ধরে সড়কটিতে যাত্রীরা ভোগান্তির শিকার। খানাখন্দে ভরা সড়কে চলতে গিয়ে আমাদের পরিবহণগুলো বিকল হচ্ছে। আমরা লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছি। মহাসড়কের পান্নারপুল এলাকার বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন বলেন, পাথরবাহী ট্রাকগুলো চলাচলের সময় সড়কের পাশের দোকান ও বাড়িঘর কাঁপে।
কুমিল্লা সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা বলেন, কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি ওজন নিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। এতে নিয়মিত সংস্কারের পরও সড়কটি ঠিক রাখা যাচ্ছে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে। হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা অঞ্চলের পুলিশ সুপার মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, অতিরিক্ত ওজনের পাথরবাহী ট্রাক চলাচল বন্ধে আমরা কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছি না। বিষয়টি সড়ক বিভাগের দায়িত্ব। তারা আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ করলে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।
