Logo
Logo
×

Advertisement

নগর-মহানগর

ডিজিটাল ফরেনসিক আলামত পরীক্ষা

থমকে আছে হাজারো মামলার তদন্ত

Advertisement

Icon

আসাদুল্লা লায়ন

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

প্রযুক্তির প্রসার ও ডিভাইসের সহজলভ্যতার সঙ্গে বদলাচ্ছে অপরাধের ধরন। এতে সাইবার অপরাধসংক্রান্ত ঘটনা ছাড়াও মাদক, হত্যা ও চুরির মতো অপরাধসহ প্রায় সব ধরনের ফৌজদারি মামলায় ডিজিটাল ফরেনসিকের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। অনেক ক্লুলেস মামলারও সমাধান মিলছে ডিভাইসের তথ্য বিশ্লেষণের পর। এমন বাস্তবতায় অপরাধ তদন্তে থানা পুলিশ ও তদন্ত সংস্থাগুলোর জব্দ করা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। তবে সেই তুলনায় পুলিশের ডিজিটাল ফরেনসিকের সক্ষমতা না বাড়ায় ক্রমাগত আলামতের জট দীর্ঘ হচ্ছে। সময়মতো ফরেনসিক রিপোর্ট না পাওয়ায় তদন্ত বা বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে মামলার তদন্তে ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণের সক্ষমতা রয়েছে অপরাধ তদন্ত সংস্থা-সিআইডির। তদন্ত সংস্থাটির সদর দপ্তর ও খুলনা বিভাগীয় ল্যাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বেসরকারি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ফরেনসিকের সুবিধা পেয়ে থাকেন। ২০১২ সাল থেকে ঢাকা ও ২০২২ সাল থেকে খুলনায় চালু হওয়া ডিজিটাল ল্যাবে আলামতের চাপও এখন বহুগুণ। আলামতভেদে ৬ থেকে ২ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় প্রতিবেদন পেতে। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রয়েছে। সিআইডির ডিজিটাল ফরেনসিকের কিছু তথ্য দৈনিক যুগান্তর বিশ্লেষণ করেছে। এতে দেখা যায়, গত ১৫ বছরে ঢাকা ও খুলনা ল্যাবে ২৬ হাজার ৯৪২টি মামলার বিপরীতে ৭৯ হাজার ১৪৪টি আলামত গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে ১৯ হাজার ৯৪৩টি মামলার বিপরীতে নিষ্পত্তি করা হয় ৫৫ হাজার ৯৫৭টি আলামত। তথ্য অনুযায়ী, দুই ল্যাবে ঝুলে আছে ২৫ হাজার ৫৬৪ ডিজিটাল আলামত।

তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ২০১৭ সাল থেকে ব্যাপক হারে বাড়তে থাকে ডিভাইস পর্যালোচনা সংক্রান্ত ডিজিটাল প্রতিবেদন। ওই বছর নিষ্পত্তির হার ৯০ শতাংশ হলেও ২০২৬ সালে তা ৫০ শতাংশে নেমেছে। ফলে আবেদনের অর্ধেক মামলা এখনো ঝুলে আছে। কর্মকর্তারা যুগান্তরকে জানান, ফরেনসিক প্রতিবেদনের জন্য আবেদনকারীকে গড়ে ৬ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সক্ষমতা না বাড়ালে অপেক্ষা আরও বাড়তে থাকবে। কারণ পুরনো ডিভাইস দিয়ে সর্বশেষ সংস্করণের কোনো প্রযুক্তির তথ্য বিশ্লেষণ করা কঠিন কাজ। যেমন অ্যানক্রিপ্টেড অ্যাপ ও এআই প্রযুক্তি প্রতিমুহূর্তেই আপডেট হচ্ছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১২ সালে ৭ মামলায় নিষ্পত্তির হার ১০০ শতাংশ, একইভাবে ২০১৩ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ১৪ বছরের মধ্যে ২০১৩ সালে ২৪ মামলায় ১০০%, ২০১৪ সালে ৫৮ মামলায় ২২.৪১%, ২০১৫ সালে ২৫৭ মামলায় ৭১.৬০%, ২০১৬ সালে ৫৩৩ মামলায় ৫৫.৫৩%, ২০১৭ সালে ১১০৮ মামলায় ৯০.০৭%, ২০১৮ সালে ১১০৬ মামলায় ৮৩.৪৫%, ২০১৯ সালে ১৬০২ মামলায় ৫৬.৯৯%, ২০২০ সালে ২৫৯০ মামলায় ৬৪.১৭%, ২০২১ সালে ৩৫৭৯ মামলায় ৮২.৯৫%, ২০২২ সালে ৩৫৬৫ মামলায় ৭৮.৭৯%, ২০২৩ সালে ৩৫৬১ মামলায় ৯০.১৭%, ২০২৪ সালে ২৭৫৯ মামলায় ৮৬.২৬% এবং ২০২৫ সালে ৩২৯০ মামলায় নিষ্পত্তির হার ছিল ৭৪.৬৬%। এছাড়া ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ২৬০৩ মামলায় ৫০.১৩ শতাংশ নিষ্পত্তি হয়েছে।

চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত ডিজিটাল ফরেনসিকের তথ্য পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, ডিভাইস বিশ্লেষণের চাহিদা ২০১২ সালের তুলনায় বর্তমানে ৩৭২ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১২ সালে ৭ মামলায় ১৮ আলামত বিশ্লেষণ করা হয়। বিপরীতে ২০২৬ সালের জুনে ২৬০৩ মামলায় ১১ হাজার ১১১ আলামত জমা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইলেকট্রনিক আলামতের ফরেনসিক রিপোর্ট পেতে দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে তদন্তকারী কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট সময়ে আদালতে চার্জশিট দাখিল করতে পারছেন না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে আসামিরা জামিনে বেরিয়ে যাচ্ছেন। তাদের কেউ কেউ প্রাসঙ্গিক অনেক প্রমাণ লোপাটের সুযোগ পাচ্ছে। এতে করে ভুক্তভোগীরা বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

জানা গেছে, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পরীক্ষায় একজন ভুয়া পরীক্ষার্থী ধরা পড়েন। তিনি অন্য একজন পরীক্ষার্থীর হয়ে ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে ওই নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেদিনই নিকটস্থ থানায় মামলা করেন এবং অভিযুক্তকে পুলিশ গ্রেফতার করে। পরে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্তে অপরাধের সঙ্গে জড়িত আরও দুজনকে গ্রেফতার করে। যাদের একজন সেই পরীক্ষার্থী ও অপর অভিযুক্ত ছিলেন মধ্যস্থতাকারী। গ্রেফতারের পরপরই অভিযুক্তদের ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক ডিভাইস ডিজিটাল ফরেনসিকের জন্য সিআইডিতে পাঠানো হয়। এতে ফরেনসিক রিপোর্টে অভিযুক্তদের পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগ ও অপরাধসংশ্লিষ্ট তথ্য আদান-প্রদানের প্রমাণ মেলে। তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রায় ৮ মাস পর ফরেনসিক রিপোর্ট পেয়ে গত জুলাইয়ে মামলার তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দেন। মামলায় অভিযুক্তদের স্বীকারোত্তিসহ অন্যন্য তথ্য-প্রমাণ পাওয়ার পরও শুধু ফরেনসিক মতামতের জন্যই ৮ মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে।

পুলিশের সাইবারসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ডিজিটাল সূত্র ধরে অভিযুক্তকে শনাক্ত করাসহ আইনের আওতায় আনা হয়। তদন্তে অপরাধ প্রমাণে অভিযুক্তের ইলেকট্রনিকস ডিভাইসের ফরেনসিক রিপোর্ট গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া ফরেনসিক রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে অপরাধীর অন্যান্য অপরাধ ও অপরাধীর বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু দেরিতে ফরেনসিক রিপোর্ট পাওয়ায় মামলার তদন্ত শুধু দীর্ঘায়িত করে না, সঙ্গে অপরাধসংক্রান্ত আরও তথ্য প্রাপ্তি বিলম্বিত করে।

এদিকে ফরেনসিক ল্যাবের কর্মকর্তারা যুগান্তরকে মোটা দাগে ৪টি চ্যালেঞ্জের কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন ও নিত্যনতুন ধরনের সাইবার অপরাধের উত্থান, অ্যানক্রিপ্টেড ডিভাইস ও আধুনিক সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপ্লিকেশনের ডেটা উদ্ঘাটনের জটিলতা ও ল্যাবের সক্ষমতার চেয়ে বহুগুণ বেশি মামলা ও জব্দকৃত আলামতের চাপ। এছাড়া আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক যন্ত্রপাতি, সফটওয়্যার ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবও রয়েছে।

সিআইডির মিডিয়া শাখার সদ্য সাবেক বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএস) জসীম উদ্দিন খান তার দায়িত্বকালে যুগান্তরকে জানিয়েছিলেন, এই স্থবিরতা কাটাতে সিআইডি দেশের প্রতিটি বিভাগে ফরেনসিক ল্যাব চালু, আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এরই অংশ হিসাবে, কোরিয়ান সংস্থার-কোইকা সহায়তায় চট্টগ্রামে বিভাগীয় ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। ল্যাবটি শিগ্গিরই আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করবে। এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম বিভাগের মামলাগুলোর পরীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন হবে এবং ঝুলন্ত মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

ডিজিটাল ফরেনসিক আলামত পরীক্ষা থমকে আছে হাজারো মামলার তদন্ত

থমকে আছে হাজারো মামলার তদন্ত

কলমাকান্দায় স্বাবলম্বী শতাধিক পরিবার জামদানির বুননে নতুন স্বপ্ন সীমান্তে

জামদানির বুননে নতুন স্বপ্ন সীমান্তে

কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের বেহাল অবস্থা সংস্কারেও মিলছে না সুফল নেপথ্যে পাথরবাহী ট্রাক

সংস্কারেও মিলছে না সুফল নেপথ্যে পাথরবাহী ট্রাক

গোলাপবাগ মাঠ এখন মাদকসেবীদের নিরাপদ আড্ডাখানা

গোলাপবাগ মাঠ এখন মাদকসেবীদের নিরাপদ আড্ডাখানা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম