কলমাকান্দায় স্বাবলম্বী শতাধিক পরিবার
জামদানির বুননে নতুন স্বপ্ন সীমান্তে
মুছে যাচ্ছে চোরাচালানের বদনাম
Advertisement
কামাল হোসাইন, নেত্রকোনা
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার সীমান্তঘেঁষা গ্রাম বানাড়িপাড়া। এই সীমান্তে ছিল চোরাচালানের দাপট। নারী-পুরুষের অনেকেই ভারতীয় পণ্য আনা-নেওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এখন সেই গ্রামের চিত্র বদলে গেছে। ঘরে ঘরে বসেছে তাঁত। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত খটখট শব্দে তৈরি হচ্ছে জামদানি শাড়ি। কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন গ্রামের শতাধিক পরিবারের মানুষ। দুর্গম রংছাতি ইউনিয়নের গ্রামটিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে কয়েক বছরের ব্যবধানে। স্থানীয়দের ভাষ্য, নারায়ণগঞ্জ থেকে তাঁতের কাজ শিখে এসে গ্রামের কয়েকজন কাজ শুরু করার পর ধীরে ধীরে অন্যরাও এতে যুক্ত হন। এখন জামদানি বুননই গ্রামের অনেক পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। সরেজমিন দেখা যায়, গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি তাঁতে জামদানি শাড়ি বুনছেন কারিগর। কোনো বাড়িতে একটি, কোনো বাড়িতে দুটি, আবার কোনো বাড়িতে পাঁচ থেকে সাতটি তাঁতও রয়েছে। একটি তাঁতে সাধারণত দুজন কাজ করেন একজন মূল কারিগর ও অন্যজন সহকারী। ভোর থেকে শুরু করে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে কাজ।
কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি জামদানি শাড়ি তৈরি করতে এক থেকে দেড় মাস পর্যন্ত সময় লাগে। নকশা ও মানভেদে একটি শাড়ির উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যও ভিন্ন। তৈরি শাড়ি ঢাকায় নিয়ে বিক্রি করা হয়। ওই গ্রামের সাতটি তাঁতের মালিক মফিজুল ইসলাম বলেন, তিনি প্রথম এই এলাকায় জামদানি তৈরির কাজ শুরু করেন। তার অধীনে এখন ১৪ জন শ্রমিক কাজ করছেন। একজন সহকারীকে মাসে ১৫ হাজার টাকা এবং একজন কারিগরকে প্রায় ৩০ হাজার টাকা বেতন দেন তিনি। মফিজুল বলেন, ‘শুরুতে অনেকে হাসি-ঠাট্টা করত। এখন গ্রামের অনেকেই এই কাজ শুরু করেছেন। লাভের চেয়ে বড় কথা, গ্রামের মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।’
তবে এই শিল্পের প্রসারে নানা সমস্যার কথা জানান তিনি। তার ভাষ্য, তাঁত বসানোর মতো জায়গা কম। ঘরের ভেতর গাদাগাদি করে তাঁত বসিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। গ্রামের সড়কও ভালো নয়। ফলে ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে সুতা আনা এবং তৈরি শাড়ি পাঠাতে পরিবহণ খরচ বেড়ে যায়। বিদ্যুৎ সরবরাহও নিয়মিত নয়।
নারায়ণগঞ্জে কাজ শিখে আসা কারিগর ফরিদ মিয়া বলেন, ‘ঢাকায় থাকলে পরিবার গ্রামে থাকত। এখানে পরিবারের সঙ্গে থেকে কাজ করতে পারছি। আয়ও হচ্ছে, আবার পরিবারও কাছে আছে।’ তাঁত শ্রমিক রুবেল মিয়া জানান, তিনি উৎপাদনের কাজে যুক্ত। মাসে প্রায় ৩০ হাজার টাকা আয় করেন। দুটি তাঁতের মালিক সারোয়ার হোসেন বলেন, ‘জায়গা ও পুঁজি দুটিরই সংকট আছে। ঋণের ব্যবস্থা হলে আরও বড় পরিসরে কাজ করতে পারতাম। এতে আরও শ্রমিকের কর্মসংস্থান হতো।’
সম্প্রতি গ্রামটি পরিদর্শন করেন নেত্রকোনা-১ আসনের সংসদ-সদস্য ও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি তাঁত কারখানা ঘুরে দেখে সরকারি সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। তার মতে, প্রয়োজনীয় আর্থিক ও প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়া গেলে দুর্গাপুর-কলমাকান্দা এলাকা জামদানি উৎপাদনের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। যে গ্রামটিতে লোকজন একসময় চোরাচালানে যুক্ত ছিল। এখন তারা উদ্যোক্তা হিসাবে কাজ শুরু করেছেন, এই বিষয়টিতে সরকারি সহযোগিতা দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যেতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, গ্রামটিতে পাকা সড়ক, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, তাঁত বসানোর জায়গা এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে জামদানি শিল্প আরও বিস্তৃত হতে পারে। এতে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও গতি আসবে। যে গ্রাম পরিচিত ছিল চোরাচালানের কারণে, সেই গ্রাম এখন গমগম করে তাঁতের শব্দে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা পেলে বানাড়িপাড়ার জামদানি দেশের বাজার ছাড়িয়ে বিদেশেও জায়গা করে নেবে।
