বাংলার মাটির সুরে মুগ্ধ নরওয়ের কবি
ছয়শ শিশুর ‘গানের মানুষ’ উয়েরা
তিন দশক ধরে ছড়িয়ে দিচ্ছেন লালন-বাউল ভাওয়াইয়া-মুর্শিদি
Advertisement
হাবিবুর রহমান হাবীব, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম)
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভাষা অচেনা, মানুষও অপরিচিত। অথচ কয়েকটি গানের সুর ছুঁয়ে গিয়েছিল তার হৃদয়। প্রায় তিন দশক আগে কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে নারীদের কণ্ঠে শোনা সেই মারফতি-মুর্শিদি গানই বদলে দেয় নরওয়ের কবি, আলোকচিত্রী ও গবেষক উয়েরা সেথেরের জীবনের গতিপথ। সেই সুরের টানেই তিনি পরিচিত হন লালন, বাউল, ভাওয়াইয়া, মারফতি ও মুর্শিদি গানের সঙ্গে। এরপর থেকে বাংলার লোকসংগীত ও লোকদর্শনের প্রতি ভালোবাসা থেকে উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুদের হাতে তুলে দিচ্ছেন মাটির গান ও মাটির সুর। তার হাত ধরে কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের বিভিন্ন গ্রামের প্রায় ৬০০ শিশু এখন বিনা খরচে শিখছে লোকগান ও লোকবাদ্যযন্ত্র। শিশুদের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে উঠেছেন ‘গানের মানুষ’ উয়েরা নামে।
গ্রামীণ মেঠোপথ ধরে এগোলেই কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের নাওথোয়া গ্রামের মায়ালয় গুরুগৃহ থেকে ভেসে আসে শিশুদের সমবেত কণ্ঠ। কখনো লালন সাঁইয়ের গান, কখনো বাউল কিংবা ভাওয়াইয়ার সুর। জীর্ণ টিনের ঘর। নেই বড় কোনো মঞ্চ, নেই আধুনিক সংগীত বিদ্যালয়ের চাকচিক্য। তবু এই ছোট্ট ঘরেই সপ্তাহের দুই দিন চলে লোকগানের পাঠ। একতারা, দোতারা, বাঁশি কিংবা অন্য কোনো লোকবাদ্য হাতে নিয়ে শিশুরা শিখছে বাংলার মাটির সুর। গানের সঙ্গে সঙ্গে তারা শিখছে মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও মানবিকতার কথাও।
১৯৯৮ সালে বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে প্রথম বাংলাদেশে আসেন উয়েরা সেথের। কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে গিয়ে নারীদের কণ্ঠে গান শুনে মুগ্ধ হন তিনি। গানের ভাষা বুঝতেন না, কিন্তু সুরের আবেগ তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সেই অভিজ্ঞতার পর বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির প্রতি তার আগ্রহ বাড়তে থাকে। কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের লোকশিল্পী এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের সঙ্গে গড়ে তোলেন সম্পর্ক।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মায়ের তরী’ নামের সংগঠন। সংগঠনটির উদ্যোগে কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের বিভিন্ন গ্রামে গড়ে উঠেছে নয়টি গুরুগৃহ। এসব গুরুগৃহে বিনা খরচে সংগীতের প্রতি আগ্রহী শিশুদের লোকগান ও লোকবাদ্যযন্ত্রের তালিম দেওয়া হচ্ছে। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এসব গুরুগৃহে প্রায় ৬০০ শিশু প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। পাশাপাশি দুটি লোকবাদ্যযন্ত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্রেও প্রশিক্ষণ নিচ্ছে ১২৫ শিশু।
লালন, বাউল, ভাওয়াইয়া, মারফতি-মুর্শিদি গানের পাশাপাশি শেখানো হচ্ছে একতারা, দোতারা, বাঁশি, খমক, সারিন্দা, তবলা, বাংলা ঢোল ও বেহালার মতো বাদ্যযন্ত্র।
শিক্ষার্থী বলরাম চন্দ্র রায় বলে, আমাদের এখানে প্রধান গান লালন। এর পাশাপাশি আমরা বাউল, ভাওয়াইয়া, মারফতি ও মুর্শিদি গান শিখি।
এখানে আমরা শুক্রবার ও শনিবার দুই দিন গান শিখি। মায়ালয় গুরুগৃহের গুরুমা রাধারানী বলেন, আমি মায়ের তরীর একজন কর্মী।
আমরা এখানে কোনো ভেদাভেদ করি না। সবাইকেই শেখাই। কোনো পয়সা নিই না। অভিভাবকদের কাছেও এই উদ্যোগ হয়ে উঠেছে স্বস্তির জায়গা। কারণ অর্থের অভাবে অনেক শিশুর সংগীত শেখার সুযোগ হয় না। মায়ের তরীর গুরুগৃহ সেই বাধা দূর করেছে।
সংগঠনটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ৯টি গুরুগৃহ ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দেন উয়েরা সেথের। প্রতিবছর বাংলাদেশে আসেন তিনি। তার প্রতিষ্ঠিত গুরুগৃহগুলো পরিদর্শন করেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সময় কাটান এবং তাদের সঙ্গে গান করেন। ২০২৪ সালে ফকির লালন সাঁইয়ের ৫৩টি গান নরওয়েজিয়ান ভাষায় অনুবাদ করে বই প্রকাশ করেন তিনি।
‘মায়ের তরী’র নির্বাহী পরিচালক সুজন কুমার বেদ বলেন, আমি ২০১৬ সাল থেকে এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছি। আমাদের এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। তিনি আরও বলেন, এর পাশাপাশি আমরা প্রবীণ লোকসাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের জন্য ‘আনন্দ আশ্রয় কেন্দ্র’ গড়ার উদ্যোগ নিয়েছি। সেখানে প্রবীণ শিল্পীরা জীবনের শেষ সময় আনন্দে কাটাতে পারবেন। আর নবীনরা তাদের কাছে অনেক কিছু শিখতে পারবে।
মায়ের তরীর সংগঠক আলমগীর কবির বলেন, আত্মশুদ্ধি ও জীবন বিকাশের লক্ষ্যেই মায়ের তরী কাজ করছে। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ধরলার অববাহিকার শিশুদের শুধু সংগীত শিক্ষাই নয়, মানবিক বিকাশেও আমরা কাজ করছি।
হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলে উয়েরা সেথের বলেন, পৃথিবীর যেমন অবস্থা-যুদ্ধ এবং প্রকৃতির বিপর্যয়-তাতে করে এই সমাজকে সুস্থ রাখা খুবই কঠিন। সেখানে আমার মনে হয়েছে, লালন, বাউল, মারফতি, মুর্শিদিসহ লোকসংগীত সেই অস্থিরতা থেকে মানুষকে স্থির করতে পারে। মানুষকে মানবিক আর প্রকৃতিপ্রেমী করতে পারে।
