মুক্তায় নজরুলের রুপালি বিপ্লব
জমির সর্বোচ্চ ব্যবহারে গড়েছেন সমন্বিত কৃষি প্রকল্প
Advertisement
মো. পলাশ রহমান, কোটচাঁদপুর থেকে
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পড়ালেখা করেছেন প্রাণিবিদ্যায়, আর পিএইচডি ফিশারিজে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করে অর্জন করেছেন ডক্টর অব সায়েন্স ডিগ্রি। এরপর চাকরি করেন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে। তবে করোনা মহামারি তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তখন মানুষের সুস্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিয়ে অন্বেষণ করেন নিরাপদ খাদ্য। সিদ্ধান্ত নেন জৈব কৃষি প্রকল্প করার। তার স্বপ্নের সেই প্রকল্পে এখন কী নেই! মাছের সঙ্গে মুক্তা চাষ, মাশরুম, দেশি-বিদেশি নানা জাতের ফল, সবজি, ট্রাইকো কম্পোস্ট প্ল্যান্ট, স্মার্ট ইরিগেশন, জিরো এনার্জি কুলিং চেম্বার, মিশ্র ও রঙিন মাছের চাষ। তিনি মূলত মাছের সঙ্গে একই পুকুরে আধুনিক পদ্ধতিতে মুক্তার চাষ করে এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন।
পড়ছিলেন ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরের ড. নজরুল ইসলামের জীবনের গল্প। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে তিনি নিজ গ্রাম শিবপুরে মাছ ও মুক্তাচাষের পাশাপাশি জমির সর্বোচ্চ ব্যবহারে গড়েছেন ‘রাইয়ান জৈব কৃষি প্রকল্প’। চাকরি ছেড়ে সম্ভাবনাময় মুক্তাচাষে স্বাবলম্বী হয়েছেন এই কৃষি উদ্যোক্তা। প্রায় চার একর জমির কৃষি প্রকল্পের একটু জায়গাও ফাঁকা রাখেননি তিনি। এসবের পাশাপাশি তিনি এখন দেশি ফলমূলকে ড্রাই করে বিদেশে রপ্তানির উদ্যোগ নিচ্ছেন। তার দাবি, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে স্বাদুপানিতে মাছের সঙ্গে মুক্তাচাষকে আরও সমৃদ্ধিশালী করা সম্ভব। মুক্তাচাষ সমৃদ্ধিশালী করা গেলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি দেশের বেকারত্ব কমাতে এটি ভূমিকা রাখবে।
নজরুল ইসলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণিবিদ্যায় পড়ালেখা শেষে ফিশারিজে পিএইচডি করেছেন। পরে জাপানের সিজুওকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করে ডক্টর অব সায়েন্স ডিগ্রি নেন। দেশে ফিরে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সিতে (জাইকা) কাজ করেন। পরে ২০১৯ সালে করোনাকালে তার ভাগ্য বদলে যায়।
সরেজমিন দেখা যায়, রাইহান জৈব কৃষি প্রকল্পে ৫০ শতকের একটি পুকুরে মাছের সঙ্গে মুক্তাচাষ করছেন ড. নজরুল। ওই পুকুরে বর্তমানে পাঁচ হাজার ঝিনুক রয়েছে। বছর ঘুরতেই পাঁচ হাজার ঝিনুক থেকে দশ হাজার মুক্তা পাওয়া যাবে। বছরে একটি ঝিনুকের জন্য খরচ ৫০ টাকা। এর পাশের একটি পুকুরে পাবদাসহ সাদা মাছ চাষ করছেন তিনি। পুকুরের পাশে দার্জিলিং ও চাইনিজ কমলালেবু লাগানো হয়েছে। এর নিচে লাগানো হয়েছে আনারস। পুকুরে পাশে রয়েছে উন্নত জাতের পেঁপে। পুকুরের দক্ষিণে রয়েছে ভিয়েতনামি নারিকেল গাছ। ওডিসি-৩ সজিনা, ড্রাগন, খাটো জাতের লাল কাঁঠাল, লাল কলা-পেয়ারা ও জাপানের জাতীয় ফল পারসিমন, রামবুটান, করোসাল, ইনসুলিন প্ল্যান্ট ও জাপানের সূর্যডিম আম এবং ৮টি উন্নত জাতের আঙুরসহ প্রায় ২৫ ধরনের ফল চাষ করা হয়েছে। এছাড়া তিনি অল্প জায়গায় নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে শিংমাছ ও রঙিন মাছের চাষ করেছেন।
উদ্যোক্তা নজরুল বলেন, চাকরি ছেড়ে মুক্তাচাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছি। তবে যদি সরকার বৃহৎপরিসরে মুক্তাচাষের একটি প্রকল্প গড়ে তোলে, তাহলে ঝিনুকের শহরকে মুক্তার নগরী হিসাবে গড়ে তোলা সম্ভব। এছাড়া আমি ড্রাই ফুডস নিয়ে কাজ করছি। আমাদের ফল ড্রাই করে বিদেশে রপ্তানি করতে পারলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হবে। সেক্ষেত্রে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন। কারণ, আমাদের মতো উদ্যোক্তারা সব জায়গায় যেতে পারেন না। আমরা যদি মৎস্য বা কৃষি অধিদপ্তরের সহযোগিতা পাই, তাহলে আমাদের জন্য এসব কাজ করা আরও সহজ হয়ে যাবে। মানুষের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে প্রকল্পটি গড়েছি। এখানে মাছ ও মুক্তার পাশাপাশি প্রায় ২৫ ধরনের ফলমূল ও শাকসবজি চাষ করেছি।
ঝিনাইদহ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা অভিজিৎ শীল বলেন, এই চাষকে যদি সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়, তাহলে দ্রুত বাণিজ্যিকভাবে এ চাষের প্রসার ঘটানো সম্ভব। আমরা চেষ্টা করছি। পাশাপাশি আমাদের ডায়মন্ড সেক্টরে যারা আছেন, তাদেরও বিষয়টি প্রচারে এগিয়ে আসতে হবে।
