শারদীয় দুর্গোৎসব : পেটের তাগিদে নয়
শখ আর ভালোবাসায় টিকে আছে প্রতিমা গড়ার শিল্প
Advertisement
আতাউল করিম খোকন, ময়মনসিংহ
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শারদীয় দুর্গোৎসব মানেই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মনে আনন্দের জোয়ার, ঢাকের আওয়াজ আর আলোঝলমলে মণ্ডপের আলোকচ্ছটা। ময়মনসিংহে দেবী দুর্গার আগমনি বার্তায় চারদিকে যখন উৎসবের সাজসাজ রব, তখন মণ্ডপের সেই মূল প্রাণ-প্রতিমা গড়ে তোলা মৃৎশিল্পীদের ঘরে নেমেছে চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তার কালো ছায়া। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আকাশচুম্বী দাম এবং প্রতিমা তৈরির কাঁচামালের দর বৃদ্ধির এই যুগে প্রতিমা বানিয়ে জীবন চালানো তো দূরের কথা, খরচের টাকাই উঠছে না তাদের। পেট চালানোর আশা ছেড়ে দিয়ে অনেক প্রবীণ কারিগর শুধু বাপ-দাদার স্মৃতি রক্ষা আর শখের বশে টিকিয়ে রেখেছেন এই ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প। মৃৎশিল্পী শম্ভু দাস বলেন, পূজার সময় চলে এসেছে, এখনো অনেক কাজ বাকি। প্রতিমা তৈরির কারিগর এখন আর আগের মতো পাওয়া যায় না। কম টাকায় কারিগররা কাজ করতে চান না। তারা এখন আগের দামে কাজ করতে চান না। যারা প্রতিমা কিনবেন (পাটি), তারাও ঠিকমতো দাম দেন না। পাঁচ-ছয় বছর আগে প্রতিমার দাম ছিল ২০-২৫ হাজার টাকা। এখনো আগের দামেই প্রতিমা নিতে চান। আমাদের আসলে কিছুই করার নেই, এখন শুধু শখের জন্য কম টাকায় প্রতিমা তৈরি করি। জিনিসপত্রের যে দাম বাড়লেও প্রতিমার দাম আর বাড়ে না। আগের সঙ্গে তুলনা করলে এখন এই টাকা কিছুই না। মৃৎশিল্পীদের কথা কেউ ভাবে না।
তিনি আক্ষেপ করে আরও বলেন, সবকিছুর দাম যে হারে বেড়েছে, তাতে মূর্তি গড়ার খরচই ওঠে না, লাভ তো দূরের কথা। আগে এই কাজ করে সংসার চলত, ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা করাতাম। আর এখন কারিগরদের বেতন দিতেই হিমশিম। জীবিকার কথা ভাবলে অনেক আগেই এই কাজ ছেড়ে দিতাম। কেবল রক্তের টানে, দেবীর প্রতি ভক্তি আর শখের বশে এখনো মণ্ডপে মণ্ডপে মা দুর্গাকে রূপ দিয়ে যাচ্ছি।
মৃৎশিল্পী পল্টু দাস বলেন, প্রতিমা তৈরির প্রতিটি উপাদানের দাম বিগত কয়েক বছরে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। মাটির ট্রলি চড়া দামে কিনতে হচ্ছে। বাঁশ, খড়, সুতলি, পেরেক, পাটের চুল, বিভিন্ন রঙের কেমিক্যাল এবং দেবীর শাড়ি ও অলংকার-সবকিছুর দাম ধরাছোঁয়ার বাইরে। সেই তুলনায় মিলছে না প্রতিমার সঠিক মূল্য। সবশেষে আমাদের লাভের তুলনায় ক্ষতি হয় বেশি।
তিনি আরও বলেন, মাসের পর মাস ঘাম ঝরিয়ে প্রতিমা তৈরি করে হস্তান্তরের পরও বহু পুজো কমিটি সময়মতো টাকা মেটায় না। অগ্রিম বা বায়নার সামান্য কিছু টাকা দিয়ে প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার পর বাকি পাওনা পরিশোধে চলে দীর্ঘসূত্রতা। অনেক সময় বাজেটের অজুহাত দেখিয়ে বকেয়া টাকা আটকে রাখা হয়, আবার কখনো কখনো সেই টাকা আর পুরোপুরি মিলেই না।
মৃৎশিল্পী জয়ন্ত পাল বলেন, এ বছর আমি ১৫টি প্রতিমা তৈরি করছি। গত বছর ২২টি প্রতিমা তৈরি করেছিলাম। এ বছর প্রতিমার অর্ডার আছে; কিন্তু কারিগর সংকট, জিনিসের দাম অনেক বেশি। পার্টি প্রতিমার দাম আগের মতোই দিতে চায়। কারিগর সংকটের কারণে এ বছর প্রতিমা কম তৈরি করছি। আসলে এ কাজই যেহেতু শিখেছি, তাই শখের জন্যই প্রতিমা তৈরি করে যাচ্ছি। আর মৃৎশিল্পীদের এ অবস্থা থাকলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটাও হারিয়ে যাবে।
১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হবে। পূজামণ্ডপগুলোয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এবার নগরী ও জেলা সদরে ৯০টিসহ জেলায় ৮০৬টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। সরকারি ও সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা এখন সময়ের দাবি। তা না হলে অচিরেই হারিয়ে যাবে শতাব্দীপ্রাচীন এই প্রতিমা গড়ার শিল্প।
