সাজেক থেকে কাপ্তাই
অধিকাংশ রিসোর্টে নেই ফায়ার ছাড়পত্র
Advertisement
সুশীল প্রসাদ চাকমা, রাঙামাটি
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পাহাড়, হ্রদ আর মেঘের মায়াবী চাদরে ঘেরা রাঙামাটি পার্বত্য জেলা। দেশের অন্যতম এই পর্যটন জোনে প্রতিবছর লাখো পর্যটক ভিড় করেন। তবে এই চোখজুড়ানো সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ ঝুঁকি। কারণ রাঙামাটি সদর, কাপ্তাই ও সাজেক ভ্যালির অধিকাংশ আবাসিক হোটেল ও রিসোর্টের কোনো ফায়ার ছাড়পত্র নেই। এমনকি জেলা প্রশাসনের কাছে নেই হোটেল-রিসোর্টের পূর্ণাঙ্গ তালিকাও।
এর আগে সাজেক ভ্যালিতে একাধিক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটলেও টনক নড়েনি প্রশাসন ও ব্যবসায়ীদের। সর্বশেষ শনিবার কক্সবাজারে রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে পর্যটকদের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর আবারও সামনে এসেছে রাঙামাটির পর্যটন কেন্দ্রগুলোর চরম অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার চিত্র।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাঙামাটি জেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের কাছে জেলায় মোট কতগুলো হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট বা হালনাগাদ তালিকা নেই। সরকারি দপ্তরের এই সমন্বয়হীনতার সুযোগে রাঙামাটি সদর, কাপ্তাই ও দুর্গম সাজেক ভ্যালিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে শত শত অননুমোদিত কটেজ ও রিসোর্ট। বিশেষ করে বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালিতে পর্যটন ব্যবসার প্রসারের সঙ্গে রিসোর্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই শতাধিক। পাহাড়ের ঢালে কাঠ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি এসব কটেজে আগুন নেভানোর কোনো আধুনিক ব্যবস্থা নেই। অতীতে সাজেকে একাধিক কটেজ সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়ার পরও স্থায়ী ফায়ার স্টেশন গড়ে ওঠেনি।
একই চিত্র রাঙামাটি সদর ও কাপ্তাইয়ের লেকভিউ রিসোর্টগুলোরও। কাপ্তাই হ্রদের তীর ঘেঁষে এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা বহু রিসোর্টে প্রবেশের রাস্তা অত্যন্ত সরু। ফলে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পৌঁছানোর মতো কোনো সুযোগ নেই। সরকারি পর্যটন মোটেলসহ নামমাত্র কয়েকটি প্রথম সারির হোটেল ছাড়া বাকিগুলোর অধিকাংশেরই ফায়ার ছাড়পত্র নেই। অনেক হোটেলে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করা হলেও নেই কোনো গ্যাস ডিটেক্টর বা পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র।
রাঙামাটি শহরের জজ আদালতসংলগ্ন আবাসিক হোটেল কসমসের চতুর্থতলার রুফটপ রেস্টুরেন্টে গত ৯ সেপ্টেম্বর ভোরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে রেস্টুরেন্টের সিলিং, রান্নাঘর, এসি, ফ্রিজ, কম্পিউটার ও আসবাব পুড়ে প্রায় অর্ধকোটি টাকার ক্ষতি হয়। এরপরও টনক নড়েনি সংশ্লিষ্টদের।
তবে কক্সবাজারে রিসোর্ট ট্র্যাজেডির পর নড়েচড়ে বসেছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। রোববার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও রিসোর্ট মালিকদের নিয়ে জরুরি বিশেষ সভা করেন জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী। এতে হোটেল মালিকদের কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। রিসোর্ট ও হোটেল মালিকদের আগামী ৭ দিনের মধ্যে ফায়ার সেফটি নিশ্চিত করার জন্য চূড়ান্ত আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে।
অতীতে সাজেক ভ্যালি পর্যটন কেন্দ্রের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড থেকে শিক্ষা না নেওয়ায় ছাড়পত্রহীন রিসোর্টে বাড়ছে মহাবিপর্যয়ের ঝুঁকি। রাঙামাটির সাজেক ভ্যালিতে ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। সাজেক ইকো ভ্যালি রিসোর্ট থেকে সূত্রপাত হওয়া সেই আগুনে মুহূর্তেই অবকাশ, মেঘছুটসহ প্রায় ৯৪টি রিসোর্ট, কটেজ ও বসতঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
রাঙামাটি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) নিউটন দাস বলেন, রাঙামাটি সদরসহ সাজেক ও কাপ্তাইয়ের বেশির ভাগ আবাসিক হোটেল ও রিসোর্টেই অগ্নিনিরাপত্তা পর্যাপ্ত নয়। বেশির ভাগ হোটেল-রিসোর্টের ফায়ার ছাড়পত্র নেই। রাঙামাটি জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো আপস করা হবে না।
