Logo
Logo
×

Advertisement

নগর-মহানগর

ইনানী ট্র্যাজেডি

আরেক লাশের সন্ধানে ধ্বংসস্তূপে ফের তল্লাশি

১০ লাশের কোনটি প্রিয়জনের, জানেন না কেউ * মর্গের সামনে স্বজনদের আহাজারি; ডিএনএ পরীক্ষার অপেক্ষা

Advertisement

Icon

কক্সবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

একটি ফোনকলের অপেক্ষা, পরিচিত মুখের খোঁজ, প্রিয়জনের ভাগ্যে কী ঘটেছে-সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আঁকুতি। কেউ খুঁজছেন স্ত্রীকে, কেউ দুই শিশুসন্তানসহ পুরো পরিবারকে। কেউ আবার ছয় ভাগিনা-ভাগনির সন্ধানে হাসপাতালের মর্গ থেকে ছুটছেন পুড়ে যাওয়া রিসোর্টের ধ্বংসস্তূপে। মর্গে পড়ে আছে ১০টি লাশ। কিন্তু কোনটি কার প্রিয়জন, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না কেউ। স্বজনদের চোখে পানি, মনে একটাই প্রশ্ন-প্রিয়জনরা কোথায়? ১০টি লাশ উদ্ধার করা হলেও এখনো একজন নিখোঁজ রয়েছেন। তার সন্ধানে রিসোর্টটিতে আবারও তল্লাশি চালিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের সামনে রোববার ও সোমবার দেখা গেছে এমনই হৃদয়বিদারক দৃশ্য। উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার টুপটুপ রেস্ট্রো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের দুদিন পেরিয়ে গেলেও উদ্ধার হওয়া ১০টি লাশের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।

নিখোঁজ বা মৃত্যুর তালিকায় ১১ জন : নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের দ্বিতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী নাহিদুর রহমান, তার স্ত্রী আফসানা মতিন তানজি ও দুই শিশুমেয়ে। নিখোঁজ রয়েছেন ছাত্রদল নেতা ফয়সাল দেওয়ানের স্ত্রী মুক্তা, ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান ও মিলিতা মেহেজাবিন, খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান ও নাফিসতা মীম, চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির এবং পাঁচ বছর বয়সি ফায়িজান আহম্মেদ। এখন স্বজনদের অপেক্ষা ডিএনএ পরীক্ষার ফলের।

শেষ ফোনকলের স্মৃতি তাড়া করছে খালিদকে : নাহিদুর রহমানের চাচাতো ভাই মোহাম্মদ খালিদ উখিয়ার পালংখালীতে কর্মরত। যশোরের মনিরামপুর উপজেলার মোহনপুরের বাসিন্দা নাহিদের সঙ্গে শুক্রবার সকালে তার শেষ কথা হয়। খালিদ বলেন, ‘শুক্রবার সকালে নাহিদ ফোন করেছিল। বলেছিল, দেখা করব। শনিবার সকালে রিসোর্টে আগুনের খবর শোনার পর ফোন করলে আর ধরেনি। তখনই বুকটা ছ্যাঁত করে উঠেছিল।’ সেই আশঙ্কা নিয়েই রোববার বিকালে হাসপাতালের মর্গের সামনে অপেক্ষা করছিলেন খালিদ। এখনো জানেন না, তার চাচাতো ভাইয়ের পরিবারের ভাগ্যে কী ঘটেছে।

চার সদস্যের পরিবারের খোঁজে ডলার : স্বজনদের খোঁজে ঢাকা থেকে কক্সবাজারে ছুটে এসেছেন ডলার মাহমুদ। তার চাচাতো বোনের মেয়ে তাজিন, তাজিনের স্বামী নাহিদুর রহমান ও তাদের দুই সন্তান নিখোঁজ। আগুনের খবর পাওয়ার পর থেকে পুড়ে যাওয়া রিসোর্টের ধ্বংসস্তূপ ও হাসপাতালের মর্গে ছোটাছুটি করছেন তিনি। ডলার বলেন, ‘চাচাতো বোনের কাছেই বড় হয়েছি আমি, তাই এই বিপদে সবচেয়ে বেশি দায়িত্বটা আমারই। খবর পাওয়ার পর থেকে স্থির থাকতে পারিনি। পোড়া রিসোর্টে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে খুঁজেছি, এখন মর্গে আইনি জটিলতা মেটানোর চেষ্টা করছি।’

শৌচাগার থেকে জড়াজড়ি অবস্থায় উদ্ধার হওয়া তিনটি লাশ নাহিদের পরিবারের সদস্যদের হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ডলার। তবে ডিএনএ পরীক্ষার ফল ছাড়া তা নিশ্চিত নয়। একই অনিশ্চয়তায় অপেক্ষা করছেন ফয়সাল দেওয়ান। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে নিখোঁজ তার স্ত্রী মুক্তা। উদ্ধার হওয়া ১০টি লাশের মধ্যে স্ত্রীর লাশ আছে কি না, তাও নিশ্চিত নন তিনি।

ফয়সাল বলেন, ‘আমার আর হারাবার কিছু নেই। আইনের কাছে আমরা বাঁধা। প্রক্রিয়া শেষে যেন দ্রুত স্ত্রীর লাশটা ফিরে পাই। যেন শেষবারের মতো সুন্দরভাবে তাকে বিদায় জানাতে পারি, দাফনের কাজটুকু করতে পারি।’

ছয় ভাগিনা-ভাগনির খোঁজে স্বজনরা : নিখোঁজ ছয় ভাগিনা-ভাগনির সন্ধানে উদ্বিগ্ন ইলিয়াস, রিয়াজ মাহমুদ রিপন ও আমিনুল ইসলাম। তাদের খোঁজে শনিবার থেকে কখনো রিসোর্টের ধ্বংসস্তূপে, কখনো হাসপাতালের মর্গে ছুটছেন স্বজনরা। নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন-ফারিহা কবির ও তার পাঁচ বছর বয়সি সন্তান ফায়িজান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাফিজ তেহামী (জেরিফ), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলা এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মিলিতা মেহেজাবিন আলভী ও ইসরাত জাহান মালিহা। বাড়ি থেকে একের পর এক ফোন আসছে আমিনুল ইসলামের কাছে। স্বজনরা জানতে চাইছেন, কোনো খবর পাওয়া গেছে কি না। তাদের সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজেও কান্না ধরে রাখতে পারছেন না তিনি। মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে ভিডিও কলে স্বজনদের পরিস্থিতি দেখাতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন রিয়াজ মাহমুদ রিপন।

পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষা, চলছে তল্লাশি : শনিবার সকালে পাটুয়ারটেক সৈকতের কাঠের তৈরি টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে। উদ্ধার হওয়া ১০টি লাশ এতটাই বিকৃত যে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। হাত, গলা কিংবা পায়ের অলংকার দেখে স্বজনরা পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করলেও মিলছে না সমাধান। রোববার সন্ধ্যায় লাশগুলোর ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়। কক্সবাজারে পরীক্ষার ল্যাব না থাকায় নমুনা ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। পরীক্ষার ফল পাওয়ার পর পরিচয় নিশ্চিত করে লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান।

নিখোঁজ আরেকজনের সন্ধানে রিসোর্টে আবারও তল্লাশি চালিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন) লে. কর্নেল আজাদ আনোয়ার বলেন, অতিরিক্ত তাপের কারণে ধ্বংসস্তূপের সব জায়গায় তল্লাশি চালানো সম্ভব হয়নি। কাঠের তৈরি ওপরের তলাগুলো ভেঙে নিচে পড়ে যাওয়ায় কেউ চাপা পড়ে আছেন কি না, তা দেখতে রোববার নতুন করে তল্লাশি চালানো হয়। তবে কোনো লাশ পাওয়া যায়নি।

তদন্ত কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান জানান, নিখোঁজ ব্যক্তিরা অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টের ভেতর ছিলেন, নাকি বাইরে-তা নিশ্চিত হতে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও তদন্তকারী দল কাজ করছে। তাদের মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক লোকেশনসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান বলেন, মারা যাওয়া ১০ জনের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডিএনএ পরীক্ষার ফল পেতে কিছুদিন সময় লাগতে পারে। অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ ছয়জনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তারা হলেন-চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন, তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান, মান্নান, মেহেরুন্নেসা, মাসুদ ও সামিদা। তাদের মধ্যে অবস্থার অবনতি হওয়ায় চারজনকে শনিবার বিকালে বিমানে ঢাকায় পাঠানো হয়। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল জানান, বর্তমানে অগ্নিকাণ্ডে আহত কোনো রোগী হাসপাতালে ভর্তি নেই।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন চেয়েছে মন্ত্রণালয় এলজিইডির ৬ শতাধিক প্রকৌশলী ক্যাডার হচ্ছে

এলজিইডির ৬ শতাধিক প্রকৌশলী ক্যাডার হচ্ছে

ব্ল্যাক রাইসে স্বপ্ন কৃষকের

ব্ল্যাক রাইসে স্বপ্ন কৃষকের

ইনানী ট্র্যাজেডি আরেক লাশের সন্ধানে ধ্বংসস্তূপে ফের তল্লাশি

আরেক লাশের সন্ধানে ধ্বংসস্তূপে ফের তল্লাশি

ব্রহ্মপুত্রে তীব্র ভাঙন রৌমারীতে এক সপ্তাহে নদীগর্ভে ১৭ ভিটে

রৌমারীতে এক সপ্তাহে নদীগর্ভে ১৭ ভিটে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম