কুমিল্লায় যুবদল নেতা হত্যাকাণ্ড
নেপথ্যে পাউবোর জমি নিয়ে বিরোধ
ঘাতক বিএনপিতে অনুপ্রবেশকারী আ.লীগকর্মী তৌহিদ * সরকারি সম্পত্তি দখল, সুদের কারবার, সালিশ দরবারসহ নানা অপকর্ম পুনরায় চালু করতে বিএনপিতে অনুপ্রবেশ
Advertisement
কুমিল্লা ব্যুরো
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কুমিল্লায় যুবদল নেতা আবু কাউছার হত্যার নেপথ্যে রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) জমি নিয়ে বিরোধ। শহরতলীর ছত্রখিল এলাকার পাউবোর মূল্যবান সরকারি সম্পত্তি দখল, সুদের কারবার, সালিশ দরবারসহ নানা অপকর্ম পুনরায় চালু করতে বিএনপিতে অনুপ্রবেশ করেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মী ‘ঘাতক’ তৌহিদুল আলম এবং তার পরিবার। সম্প্রতি জেলা বিএনপির এক শীর্ষ নেতার হাতে ফুল দিয়ে দলটিতে অনুপ্রবেশ করেন ৭ মামলার আসামি তৌহিদ। তার এ ছবি এখন সামাজিক মাধ্যমে ভাসছে। এদিকে বিএনপির ছত্রছায়া পেয়েই বেপরোয়া হয়ে ওঠে বিতর্কিত এ পরিবার। এতে ওই এলাকার বাসিন্দারা ফের জিম্মি হয়ে পড়েন পরিবারটির কাছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুমিল্লার শহরতলীর ছত্রখিল এলাকায় ব্যাপক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা খোরশেদ আলম পরিবার। ওই এলাকায় পরিবারটি আতঙ্কের নাম। স্থানীয়রা জানান, ফ্যাসিবাদের ১৭ বছর খোরশেদ আলম, তার ছেলে তৌহিদুল আলম এবং তানজির আলম ওই এলাকায় সুদের কারবার, জমির দালালি, সরকারি জায়গা দখল, নদীর মাটি বিক্রি, সালিশ দরবারসহ নানা অপকর্মে লিপ্ত ছিলেন। এলাকার লোকজন পরিবারটির কাছে একপ্রকার জিম্মি ছিলেন। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর পরিবারটি থমকে গেলেও তাদের কোনোরূপ ক্ষতি হয়নি। এরই মাঝে বৈষম্যবিরোধী মামলায় গ্রেফতার হয়ে কয়েকমাস কারাগারে ছিলেন তৌহিদ। সম্প্রতি কারাগার থেকে বেরিয়ে বিএনপিতে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছিলেন তিনি। সম্প্রতি এলাকায় শহীদ জিয়া স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করে স্থানীয় যুব সমাজ। সেখানে জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতার হাতে ফুল দিয়ে নিজেকে বিএনপি দাবি শুরু করেন যুবদল নেতা কাউছারের প্রধান ঘাতক তৌহিদ।
স্থানীয়রা জানান, বিএনপি নেতার হাতে ফুল দেওয়ার পর ফের বেপরোয়া হয়ে ওঠে আওয়ামী লীগ নেতা খোরশেদ আলমের পরিবার। আবারও শুরু হয় সুদ, সালিশ, জমির দালালি এবং সরকারি জায়গা দখলসহ নানা অপকর্ম। কয়েকদিন আগে যুবদল নেতা আবু কাউছারের বন্ধু শামীম হোসেনের মালিকানাধীন জায়গার সামনে পাউবোর জায়গায় জোরপূর্বক রেস্টুরেন্ট নির্মাণ শুরু করেন তৌহিদ। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা দেখা দিলে দফায় দফায় সালিশ বৈঠক করা হয়। কিন্তু এসব সালিশ বৈঠক পাত্তা দেননি তৌহিদ ও তার সহযোগীরা। জোরপূর্বক পাউবোর জায়গা দখল করে রেস্টুরেন্ট নির্মাণ অব্যাহত রাখেন। এতে বাধা দেন যুবদল নেতা আবু কাউছার।
স্থানীয়রা জানান, শুক্রবার বিরোধ মেটানোর কথা বলে কাউছারকে ঘটনাস্থলে ডাকেন তৌহিদ। এ সময় কাউছার শামীমসহ ৩-৪ জনকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যান। তৌহিদ আগে থেকে ওতপেতে থাকে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে। ঘটনাস্থলে যাওয়ার পরপরই কাউছারকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকেন। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় কাউছারের ভাই কবির হোসেন বাদী হয়ে পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করেছেন। পুলিশ প্রধান ঘাতক তৌহিদ এবং তার ভাই তানজিরকে গ্রেফতার করেছে। ছত্রখিল এলাকার বাসিন্দা একরাম হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগের ১৭ বছরে খোরশেদ আলম এবং তার ছেলেরা এলাকায় নানা অপকর্ম করেছেন। ৫ আগস্টের পর এসব বন্ধ থাকলেও সম্প্রতি তার ছেলে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর তারা আগের মতোই অপকর্ম শুরু করেন।
ভিকটিম যুবদল নেতা কাউছারের বড়ভাই কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা যুবদলের সাবেক সহসভাপতি কবির হোসেন বলেন, খোরশেদ আলমের পরিবার ব্যাপক অত্যাচারী এবং ঘোরতর আওয়ামী লীগ। সম্প্রতি বিএনপিতে আশ্রয় নিয়েই তারা আগের মতো অপকর্ম শুরু করে। শেষ পর্যন্ত আমার প্রতিবাদী ভাইকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তাদের বিএনপিতে আশ্রয় দেওয়া নেতাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, এ ধরনের অত্যাচারী খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া মোটেও ঠিক না। এ ক্ষেত্রে আমাদের দলের নেতাদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, ছত্রখিল এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি দখল কেন্দ্র করে যুবদল নেতা আবু কাউছারকে খুন করা হয়েছে। তৌহিদ বিরোধপূর্ণ জমিতে রিসোর্ট নির্মাণের উদ্যোগ নিলে শামীম ও তার বন্ধু আবু কাউছার বাধা দেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত হয়। পুলিশ সুপার বলেন, জমির বিরোধ মীমাংসায় শুক্রবার একটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। সেখানে পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে তৌহিদ, তার ভাই ও তাদের সহযোগীরা কাউছারকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে জখম করেন। এতে তার মৃত্যু হয়। আমরা বিষয়টি যথাযথভাবে তদন্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দায়ের করব।
