ছোট ফেনী নদীর ভাঙনে বসতভিটা হারানোর শঙ্কা
স্মৃতি আঁকড়ে বাঁচার লড়াইয়ে খোদেজা
নুরুজ্জামান সুমন, ফেনী
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
স্বামী মারা গেছেন ছয় বছর আগে। রেখে গেছেন ছয় সন্তান আর ২৪০ শতক জমির ওপর গড়ে তোলা এক সংসার। সেই জমিই ছিল খোদেজা আক্তারের শেষ আশ্রয়, সন্তানদের নিয়ে বেঁচে থাকার অবলম্বন। কিন্তু ছোট ফেনী নদীর ভাঙনে হারিয়ে গেছে সেই জমির বড় অংশ। অবশিষ্ট আছে মাত্র ৬০ শতক। যে বসতভিটায় স্বামীর স্মৃতি আঁকড়ে সন্তানদের নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেটুকুও এখন নদীতে বিলীন হওয়ার শঙ্কায়।
ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার চর দরবেশ ইউনিয়নের চর সাহাভিকারী গ্রামের বাসিন্দা খোদেজা আক্তার। নদীর দিকে তাকিয়ে তার চোখে এখন শুধুই কান্না আর অনিশ্চয়তা। স্বামীর রেখে যাওয়া শেষ স্মৃতিটুকু হারিয়ে যাওয়ার কষ্ট তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফিরছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে খোদেজা বলেন, ‘আমার স্বামী মারা গেছেন ছয় বছর আগে। ৬০ শতক বাদে বাকি জমি নদীতে চলে গেছে। স্বামীর রেখে যাওয়া শেষ স্মৃতিটুকুও হারিয়ে যাচ্ছে। ছেলেমেয়েদের নিয়ে কোথায় মাথা গোঁজার ঠাঁই পাব, তা ভেবে দিশাহারা হয়ে পড়েছি। এ কষ্ট ভোলার নয়।’
খোদেজার পরিবারের এই হাহাকার এখন চর সাহাভিকারী গ্রামের বহু পরিবারেরই বাস্তবতা। কারও চোখের সামনে ভেঙে পড়ছে ঘর, কারও ফসলি জমি তলিয়ে যাচ্ছে নদীতে। শেষ সম্বলটুকু রক্ষায় কেউ খুলে নিচ্ছেন ঘরের চাল, কেউ সরিয়ে নিচ্ছেন আসবাব ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। একসময় যে ভিটায় ছিল সংসারের কোলাহল, সেখানে এখন নদীর দিকে তাকিয়ে কাটছে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার দিন।
খোদেজার ছেলে আবু বক্কর ছিদ্দিকের কণ্ঠেও একই অসহায়ত্ব। তার চোখের সামনে হারিয়ে যাচ্ছে বাপ-দাদার ভিটা, অথচ পরিবার নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই। নতুন করে ঘর তোলার সামর্থ্যও নেই।
আবু বক্কর ছিদ্দিক বলেন, ‘আমার আর যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। শেষ সম্বল বলতে এই বসতভিটাটুকুই ছিল। এখন সেটিও নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ঘরদোরের জিনিসপত্র সরিয়ে অন্য জায়গায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছি। আগের মতো আর কিছুই নেই। হাতে টাকাপয়সাও নেই। আমরা এখন কী করব, কোথায় যাব, কিছুই বুঝতে পারছি না।’
দুই বছরে বিলীন ২৫ বসতবাড়ি, ১০০ একর জমি : চর সাহাভিকারী গ্রামে খোদেজার পরিবারের এই সংকটের পেছনে রয়েছে ছোট ফেনী নদীর অব্যাহত ভাঙন। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, গত দুই বছরে নদীতে বিলীন হয়েছে অন্তত ২৫টি বসতবাড়ি ও প্রায় ১০০ একর কৃষিজমি। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় মুছাপুর ক্লোজার ভেঙে যাওয়ার পর নদীর জোয়ার-ভাটার প্রভাবে ভাঙন বেড়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কাজীরহাট স্লুইসগেট পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় ভাঙনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অনেকের এক থেকে তিন একর পর্যন্ত জমি নদীতে চলে গেছে। বসতভিটা হারিয়ে বা হারানোর শঙ্কায় রয়েছে বহু পরিবার। নদীতীরের বিভিন্ন স্থাপনা ও মসজিদও ভাঙনের শিকার হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা আবু বক্কর ছিদ্দিক মারুফ, সিরাজ উদ্দিন, মোহাম্মদ মোস্তফা ও মাহবুবুল হক জানান, প্রতিদিনই নদীর পাড় ভাঙছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। তাদের আশঙ্কা, নদীভাঙন অব্যাহত থাকলে সোনাগাজীর বিস্তীর্ণ জনপদ, বসতভিটা ও কৃষিজমি হুমকির মুখে পড়বে। তাদের অভিযোগ, বারবার আবেদন করার পরও প্রশাসন ভাঙন প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
স্থানীয়রা নদীভাঙন প্রতিরোধে দ্রুত স্থায়ী ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন।
ক্লোজার পুনর্নির্মাণ প্রকল্পে আশা : এখন নদীভাঙন থেকে উপকূলীয় জনপদ রক্ষায় মুছাপুর ক্লোজার পুনর্নির্মাণ প্রকল্পের দিকে তাকিয়ে আছেন স্থানীয়রা। গত ২৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পেয়েছে। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭৫১ কোটি টাকা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম জানান, প্রকল্পের আওতায় সোনাগাজী অংশে নদীতীর সংরক্ষণের কাজ শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জোয়ার-ভাটার প্রভাবে সৃষ্ট ভাঙন কমানো এবং উপকূলীয় জনপদকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে।
এদিকে, বন ও পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু সম্প্রতি জানিয়েছেন, মুছাপুর রেগুলেটরের কাজ শেষ হলে নদীভাঙন সমস্যার স্থায়ী সমাধানের আশা করা হচ্ছে। এর আগ পর্যন্ত ভাঙন প্রতিরোধে অস্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সোনাগাজী ও দাগনভূঞার বিভিন্ন স্থানে ভাঙনপ্রবণ আটটি স্থান চিহ্নিত করে অস্থায়ী প্রতিরোধমূলক কাজ চলছে।
