চট্টগ্রামে বাহিনীর পরিচয়ে সক্রিয় অপহরণচক্র
Advertisement
আহমেদ মুসা, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নানা অপরাধে চাকরিচ্যুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে অপহরণচক্র। তাদের টার্গেট থাকে প্রতিষ্ঠিত বা ব্যবসায়ী। উদ্দেশ্য-নিজেদের হেফাজতে নিয়ে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায়। তারা স্থানীয় সোর্সের মাধ্যমে তথ্য নিয়ে লক্ষ্যবস্তু করা ব্যক্তিকে এলিট ফোর্স হিসাবে পরিচিত স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) পরিচয়ে তুলে নেয়। এরপর অপহৃতকে ভয় দেখিয়ে এবং স্বজনদের মোবাইল ফোনে ভীতিকর ভিডিও পাঠিয়ে মুক্তিপণ আদায় করে। এমন এক ঘটনায় ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসানকে তুলে নেয় ওই চক্র। তবে কৌশলে সেই ব্যবসায়ীকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। এ ঘটনায় চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে এক প্রেস বিফ্রিংয়ে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মাসুদ আলম।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন-গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর বাসিন্দা চাকরিচ্যুত সেনাসদস্য সুমন মুন্সি, কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার মিজানুর রহমান, উখিয়ার জয়নাল উদ্দিন, চট্টগ্রামের বাঁশখালীর আব্বাস উদ্দিন, টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৬-এর বাসিন্দা ছলিম ওরফে সেলিম ও কক্সবাজার সদরের দেলোয়ার হোসেন। বুধবার রাতে কক্সবাজারের টেকনাফের লেদা (আলীখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫ সংলগ্ন এলাকা থেকে হাসানকে উদ্ধার করা হয়।
জানা গেছে, ১৭ অক্টোবর রাত সাড়ে আটটার দিকে বাঁশখালীর পুঁইছড়ির প্রেম বাজারে কালো পোশাকের এসআরবি লেখা জ্যাকেট, কালো ক্যাপ ও মাস্ক পরিহিত কয়েকজন এসআরবির সদস্য পরিচয় দিয়ে ব্যবসায়ী হাসানকে হ্যান্ডকাফ পরান। পরে টানাহেঁচড়া করে তাকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যায়। বিষয়টি পুলিশকে জানানোর পর স্বজনরা নিশ্চিত হন যে, হাসানকে অপহরণ করা হয়েছে।
এর পর আনোয়ারা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মাহমুদুল হাসানের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ ও ডিবির কয়েকটি টিম মাঠে নামে। কয়েকদিনের অভিযানের পর বুধবার কক্সবাজার সদর থানার বাস টার্মিনাল, বাংলাবাজার ও কোর্টবাজার এলাকা থেকে ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প-সংলগ্ন এলাকা থেকে ওই ব্যবসায়ীকে উদ্ধার করা হয়। অভিযানে অপহরণে ব্যবহৃত একটি ব্যক্তিগত গাড়ি, পাঁচটি কালো রঙের এসআরবি লেখা জ্যাকেট, দুটি ভুয়া এসআরবি পরিচয়পত্র ও একটি হ্যান্ডকাফ জব্দ করা হয়।
পুলিশ সূত্র জানায়, সুমন মুন্সির বিরুদ্ধে ছিনতাই, দস্যুতা ও অস্ত্র আইনে মোট ১৩ মামলা রয়েছে। জয়নাল উদ্দিন ওরফে জুনু ও ছলিম ওরফে সেলিমের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা আছে। পুলিশ জানায়, আব্বাস ও দেলোয়ার বিভিন্ন স্থানে টার্গেট ব্যক্তিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সুমনকে দিত। এরপর সুমন ও তার সহযোগীরা এসআরবির পরিচয় দিয়ে তুলে নিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করত। হাসান বলেন, আমাকে বন্দি রেখে পাঁচ দিন কিছু খেতে দেয়নি। এর মধ্যে আমাকে একবার এক ঘর থেকে অন্য ঘরে নিয়ে যায়। এ কয়দিন তারা শারীরিকভাবে নির্যাতন করেছে।
গলায় ছুরি ধরে মুক্তিপণের জন্য চাপ : হাসানকে অপহরণের পর চক্রটি হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে তার স্বজনদের ভিডিও পাঠায়। এতে হাসানকে বলতে শোনা যায়, ‘হোয়াটসঅ্যাপ একটি নম্বর দিই, ইবাত কল দন (হোয়াটসঅ্যাপ একটি নম্বর দিয়েছি। ওই নম্বরে কল দেন।)’ আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, হাসানকে চোখ বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এ সময় তার গলায় ছুরি ধরে আছে একজন। চক্রের এক সদস্য বলছে-‘টিয়ার হতা হ, ৩০ সেকেন্ডের ভেতর, নইলে মারি ফেলাইয়ুম।’ (টাকার কথা বল, ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে, না হয় মেরে ফেলব)।
এসপি মাসুদ আলম বলেন, গ্রেফতারকৃতরা পেশাদার অপরাধী। তারা পরিকল্পনা করে ব্যবসায়ী বা ধনীদের অপহরণ করে থাকে। সুমন মুন্সি আগে উখিয়ায় র্যাবে কর্মরত ছিল। সে সময় রোহিঙ্গাদের কয়েকজনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে বিভিন্ন অপরাধে চাকরিচ্যুত হওয়া ও কারাভোগের পর মুক্ত হয়। পরে এসআরবির পরিচয়ে সে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ে একটি দল গড়ে তোলে।
