মাটি খুঁড়লেই গুপ্তধন!
বিদেশে পাচার হচ্ছে কোটি কোটি টাকার প্রত্নসম্পদ
চোরাচালানিরা ছড়িয়ে ভারত-চীন-থাইল্যান্ডে * পুনর্ভবার তীরজুড়ে বেপরোয়া মাটি খোঁড়াখুঁড়ি
Advertisement
তানভীর আলম, বগুড়া
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা হাজার বছরের অমূল্য প্রত্নসম্পদ বেচেই উত্তরবঙ্গে চলছে রাতারাতি কোটিপতি বনে যাওয়ার উন্মাদনা। একদিকে প্রাচীন দুষ্প্রাপ্য কালো পাথর বা কষ্টিপাথরের মূর্তি, অন্যদিকে ভূগর্ভ থেকে তোলা চোখধাঁধানো বহুমূল্য রঙিন পাথর পাচার করছে চোরাচালানিরা। এই রঙিন পাথর ‘দানা’ নামে পরিচিত। নওগাঁর প্রত্যন্ত নদীর তীর থেকে শুরু করে বগুড়ার প্রাচীন মহাস্থানগড়, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ হয়ে ঢাকার অভিজাত গুলশান হয়ে আকাশপথে চলে যাচ্ছে ব্যাংকক, বেইজিং কিংবা ভারতের জাবালপুর ও দিল্লির বাজারে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নওগাঁর পোরশা উপজেলার নিতপুরের টেকঠা এলাকায় পুনর্ভবা নদীর তীরবর্তী প্রায় তিন কিলোমিটারজুড়ে চলছে বেপরোয়া মাটি খোঁড়াখুঁড়ি। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শেরশাহ ও সুজাউদ্দীন আমলের ঐতিহাসিক বাণিজ্যকেন্দ্র ও প্রাচীন কালীমন্দিরকেন্দ্রিক জনপদ ছিল এই নদী অববাহিকায়। শত শত বছর আগের দেশভাগ কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভূগর্ভে চাপা পড়ে রয়েছে বিপুল প্রত্নসম্পদ। কয়েক বছর আগে টেকঠা ভিটায় মাটি কাটতে গিয়ে কিছু অমূল্য প্রত্ননিদর্শনের সন্ধান মিললে শুরু হয় খননযজ্ঞ। প্রতিদিন দলে দলে কিছু মানুষ কোদাল, শাবল হাতে চার-পাঁচ ফুট মাটি খুঁড়ে প্রাচীন স্বর্ণমুদ্রা, রুপার অলঙ্কার, বিভিন্ন রঙের চকচকে পাথর এবং কষ্টিপাথরের দুর্লভ মূর্তির খোঁজ করছে। মাত্র ১০ গ্রাম ওজনের একটি বিশেষ পাথর পেলেই অনেক সময় মিলছে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা। পার্শ্ববর্তী গ্রাম বিষ্ণুপুর থেকে আসা মনিরুল ইসলাম জানান, তারা সাত-আটজন তিন দিন ধরে মাটি খুঁড়ে জালি বল বা দানা পায়। সেটি জামিরুল নামে একজনের কাছে এক লাখ ষাট হাজার টাকায় বিক্রি করেন। নিতপুর এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য গামা জানান, প্রত্নসম্পদ রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। চোরাচালান সিন্ডিকেটসহ প্রত্ন আহরণে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
‘দানা’ পাচারে দুই ভাইয়ের নেতৃত্বে চক্র : অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, মূল্যবান ‘দানা’ এবং আস্ত ‘কষ্টিপাথরের মূর্তি’ এই দুইয়ের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে পৃথক দুই সিন্ডিকেট। দানার সিন্ডিকেট চালাচ্ছে নওগাঁর নিতপুরের নুরুল হুদার দুই ছেলে আমিরুল ও জামিরুল। তারা নামমাত্র মূল্যে মূল্যবান দানা সংগ্রহ করে পাচার করেন। তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক মাঠপর্যায় পরিচালনা করেন আতাউর রহমান মিশু, মোসাদ্দেক ও আতাবুল।
সংগৃহীত এসব দুষ্প্রাপ্য দানা তুলে দেওয়া হয় বগুড়ার নন্দীগ্রামের কীটনাশক ব্যবসায়ী সবুজের হাতে। এই সবুজ ঢাকার শীর্ষ ক্রেতা এবং সরাসরি বিদেশি বায়ারদের হাতে দানাগুলো পৌঁছে দেয়।
মহাস্থানগড় ঘিরে পাচার সিন্ডিকেট : দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট বগুড়ার প্রাচীন মহাস্থানগড়ের সুবিশাল এলাকা থেকে প্রায়ই তোলা হচ্ছে অমূল্য সব কষ্টিপাথরের মূর্তিসহ নানা প্রত্ননিদর্শন। মহাস্থানগড় এলাকার মূর্তি বাণিজ্যের অন্যতম নিয়ন্ত্রক সুজন, ধলু, রফিক (বর্তমানে জেলে আছেন) এবং এক সময় হাটে সবজি বেচা আলোচিত জহুরুল। তাদের সঙ্গে সক্রিয় সিংড়া এলাকার কালীগঞ্জের পওতা গ্রামের সাইদুর, একই উপজেলার থাওল গ্রামের মহসিন এবং শেরপুরের ফারুক, সুলতান ও গোপী ঘোষ। অন্যদিকে নাটোরের সিংড়ার চিহ্নিত মূর্তি ব্যবসায়ী মহসিন, তার ছেলে আবু সাঈদ, সাঈদুল এবং পাটুল এলাকার মামুন তৃণমূল থেকে কষ্টিপাথর সংগ্রহ করেন। একই চেইনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সিরাজগঞ্জের স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট।
গুলশান থেকে বিদেশে পাচার প্রত্নরত্ন : সারা দেশ থেকে সংগৃহীত কষ্টিপাথর, দানা ও প্রাচীন মূর্তি চলে যায় রাজধানীর গুলশান-২ ডিসিসি মার্কেটকেন্দ্রিক শীর্ষ মাফিয়া জাকিরের হাতে। সিন্ডিকেটে যুক্ত আছে জাকিরের ছেলে সুমন, সিরাজের ছেলে সমসের ও মামুন, আবুল ও তার ছেলে ফ্রান্সপ্রবাসী জিতু, জলিলের মেয়ে নাসরিন, নান্নুসহ অনেকে। এই চক্রের অন্যতম শীর্ষ সদস্য জাফর প্রত্নসম্পদ পাচার করতে গিয়ে ভারতে দীর্ঘদিন জেল খেটেছিল। বর্তমানে সে বিদেশিদের টার্গেট করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সামনে একটি পুরাতন কাসার দোকান খুলেছে। জেল থেকে বের হয়ে সে আবারও জড়িয়ে পড়েছে একই কারবারে। বিদেশি বায়াররা বারিধারার স্যুট প্যালেসসহ অভিজাত হোটেলে থেকে লেনদেন চূড়ান্ত করে। এ বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক একেএম সাইফুর রহমান জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে উদ্ধার হওয়া প্রত্ননিদর্শনগুলো প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে হস্তান্তর করা হয়। ভূগর্ভে পাওয়া যে কোনো ঐতিহাসিক প্রত্নবস্তুর একমাত্র মালিক রাষ্ট্র। সাধারণ নাগরিকরা কোনো নিদর্শন খুঁজে পেলে তা ব্যক্তিগতভাবে কেনাবেচা বা নিজের কাছে কুক্ষিগত করে রাখা সম্পূর্ণ বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ।
