ঢাকার শীর্ষস্থানীয় কলেজগুলোর ফল
কোথাও হাসি কোথাও কান্না
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
এবারের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলে রেকর্ড বিপর্যয় নেমে এসেছে। সারা দেশের বেশির ভাগ কলেজে পাশের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সঙ্গে কমেছে জিপিএ-৫ এর সংখ্যাও। তবে এর মধ্যেও রাজধানী ও এর আশপাশের বেশকিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের ধারাবাহিক সাফল্য ধরে রেখেছে। ফল বিপর্যয়ের মধ্যেও এসব প্রতিষ্ঠানে পাশের হার প্রায় শতভাগ। একই সঙ্গে জিপিএ-৫ পেয়েছেন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী। শনিবার রাজধানীর বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা যায়, ফল ঘোষণার পর শিক্ষার্থীরা বাঁধভাঙা উল্লাসে ফেটে পড়েন। আবেগে একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন সহপাঠীরা। কেউ কেউ হাতে হাত ধরে নেচে-গেয়ে উল্লাসে মাতেন। আবার অনেকের চোখে ছিল আনন্দাশ্রু। কঠোর অধ্যবসায়ের পর কাঙ্ক্ষিত ফল পেয়ে উদ্যাপনে যোগ দেন অভিভাবক এবং শিক্ষকরাও। এদিকে বেশকিছু নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিপরীত চিত্র দেখা যায়। প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিক সাফল্যে ছেদ পড়েছে এবার। ধস নেমেছে পাশের হার এবং জিপিএ প্রাপ্তিতেও। এ কারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিমর্ষ ছিলেন অভিভাবকরাও। তবে সামনের দিনগুলোতে দুর্বলতা কাটিয়ে ফের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় তাদের। ঘোষিত ফল অনুযায়ী এবার রাজধানীতে সাফল্যের নতুন মাইলফলক অর্জন করেছে যাত্রাবাড়ী এলাকার ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ। প্রতিষ্ঠানটির পাশের হার এবং জিপি-৫ সর্বোচ্চ। এছাড়া ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান হলিক্রস, পুরোনো ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, যাত্রাবাড়ীর সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, উদয়ন ও ল্যাবরেটরি কলেজ ভালো ফল করেছে। তবে ঢাকার নামকরা প্রতিষ্ঠান ভিকারুন নিসা নূন এবং মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজসহ আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ফল বিপর্যয় ঘটেছে। এছাড়া মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের আলিম পরীক্ষায় পাশের হার এবং জিপিএ পেয়ে শীর্ষস্থান লাভ করেছে দারুননাজাত সিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসা।
মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ : এ বছর এইচএসসি পরীক্ষায় ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ থেকে ৩ হাজার ১৫৬ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৩ হাজার ১৫২ জন। পাশের হার ৯৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এছাড়া মোট পরীক্ষার্থীর ৪২ শতাংশ জিপিএ-৫ পেয়েছেন (১ হাজার ৩১১ জন)। বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞান বিভাগ থেকে সর্বোচ্চসংখ্যক জিপিএ-৫ পেয়েছেন (১০৯৯ জন)। এছাড়া ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে ১২৮ জন এবং মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৮৪ জন শিক্ষার্থী।
ফল সম্পর্কে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ নয়ন বলেন, কারও একক প্রচেষ্টায় সাফল্য আসেনি। বরং এটি ধারাবাহিক শ্রমের ফসল। ক্লাসে নিয়মিত উপস্থিতি, নিবিড় তদারকি এবং শিক্ষকদের আন্তরিকতা মিলেই আজকের এই ফল। শৃঙ্খলা ও পরিকল্পনা থাকলে প্রত্যেক শিক্ষার্থী নিজের সেরাটা উপহার দিতে পারেন।
হলিক্রস : এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় ঢাকার অন্যতম নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলিক্রস কলেজে পাশের হার ৯৯ দশমিক ৬২ শতাংশ। কলেজটি থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৮১৬ জন শিক্ষার্থী। এবার কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন ১ হাজার ৩০৩ জন। এর মধ্যে এক হাজার ২৯৮ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৮১৬ জন। তবে গত বছরের তুলনায় প্রতিষ্ঠানটির জিপিএ-৫ কমেছে। গত বছর জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৯৬০ জন শিক্ষার্থী।
সেন্ট গ্রেগরি : সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেন্ট গ্রেগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি থেকে অংশ নেন ৩৭০ জন পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে ৩৬৮ জনই কৃতকার্য হয়েছেন। মোট পাশের হার ৯৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ। এছাড়া জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৭৬ জন।
তবে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি পুরান ঢাকার আরেক ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এ বছর কলেজটির ১৮৭ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে বেশির ভাগ কৃতকার্য হলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জিপিএ-৫ আসেনি। জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ৪ জন শিক্ষার্থী। এছাড়া কবি নজরুল সরকারি কলেজেও ফলাফল বিপর্যয় ঘটেছে। প্রতিষ্ঠানটির ১ হাজার ৫৭৭ জন পরীক্ষা দিয়ে পাশ করেছেন ১ হাজার ৩৬২ জন। এদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩৩ জন। পাশের সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজেও কয়েকশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। কলেজের ১ হাজার ৯১৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাশ করেছেন ১ হাজার ২১৫ জন। পাশের হার ৬৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ৩ জন।
এছাড়া ফল বিপর্যয় হয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক পরিচালিত পোগোজ ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজেও। কলেজটিতে ৮১ জন পরীক্ষা দিয়ে পাশ করেছেন ২৯ জন। যা মোট পরীক্ষার্থীর ৩৫ দশমিক ৮০ শতাংশ। প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ জিপিএ-৫ পাননি।
সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ : রাজধানীর অন্যতম খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ তাদের সাফল্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছে। ঘোষিত ফলে দেখা যায় ১ হাজার ৭৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১ হাজার ৬৭ জনই উত্তীর্ণ। পাশের হার ৯৯ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। এছাড়া জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২২৮ জন।
কলেজ ইনচার্জ ও গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান তুহিন বলেন, এমন ফলের জন্য আমরা দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছি। যেসব শিক্ষার্থী ভালো ফলসহ উত্তীর্ণ হয়েছেন আগামী দিনগুলোতে তারা আরও ভালো করবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা।
রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ : চলতি বছর এইচএসসি পরীক্ষায় রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ থেকে অংশ নেওয়া ১ হাজার ৬৩৬ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১ হাজার ৬২৬ জনই কৃতকার্য হয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির পাশের হার ৯৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ। এদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৮২৯ জন শিক্ষার্থী। যথারীতি বিজ্ঞান বিভাগ থেকে সর্বোচ্চসংখ্যক জিপিএ-৫ পেয়েছেন (৬৯৮ জন)। শনিবার দুপুরে ফল ঘোষণার পর কলেজ ক্যাম্পাসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আলী রেজা। এ সময় তিনি ভালো ফলাফলের জন্য শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানান এবং তাদের ভবিষ্যৎ শিক্ষা জীবনের সাফল্য ও সার্বিক মঙ্গল কামনা করে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন।
মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ : এ বছর মিরপুরের মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ফলে বিপর্যয় ঘটেছে। কলেজের মোট ৪২৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৩১৩ জন। পাশের হার ৭৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১ জন শিক্ষার্থী। প্রতিষ্ঠানটির এমন ফল বিপর্যয়ের পেছনে বিদ্যমান রাজনৈতিক অস্থিরতাকে অন্যতম কারণ হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
উদয়ন ও ল্যাবরেটরি কলেজ : ফল বিপর্যয়ের মধ্যেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) পরিচালিত উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা সন্তোষজনক ফল অর্জন করেছেন। দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উদয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ে পাশের হার ৯৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৯৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ। প্রতিষ্ঠান দুটিতে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০ জন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এবার পরীক্ষায় অংশ নেন ২০৪ জন। এদের মধ্যে ১৯১ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন পাঁচজন। এছাড়া উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে অংশ নেন ৩৯৬ জন পরীক্ষার্থী। এদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৩৮৬ জন। প্রতিষ্ঠানটির পাশের হার ৯৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১৫ জন।
উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আরিফ রহমান যুগান্তরকে বলেন, এমন সাফল্যের জন্য তিনি শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
মাইলস্টোন কলেজ : সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে উত্তরার মাইলস্টোন কলেজ। এ বছর প্রতিষ্ঠানটি থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ২ হাজার ৯৫৯ শিক্ষার্থীর মধ্যে পাশের হার ৯৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩১২ জন। কলেজ প্রাঙ্গণে গিয়ে শিক্ষার্থীদের আনন্দ-উল্লাস করতে দেখা যায়। প্রত্যাশিত ফল পেয়ে কেউ বন্ধুদের জড়িয়ে ধরেন, কেউ শিক্ষকদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করেন। বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশের পাশাপাশি একে অপরকে মিষ্টিমুখ করান শিক্ষার্থীরা। কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জিয়াউল আলম বলেন, বছরের পর বছর ফলের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যে কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য চ্যালেঞ্জ। নিয়মানুবর্তিতা ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাকে সাফল্যের মূল ভিত্তি উল্লেখ করে তিনি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের ধন্যবাদ জানান।
শীর্ষে দারুননাজাত : এবারের আলিম পরীক্ষার ফলাফলে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে দারুননাজাত সিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসা। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এ পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির ১ হাজার ৩০৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১ হাজার ২৯১ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫৯২ জন। সে হিসাবে পাশের হার ৯৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
প্রতিষ্ঠানটির এমন সাফল্যের পেছনে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরেছেন মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল আলহাজ মাওলানা আ. খ. ম. আবু বকর সিদ্দীক। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তিনি জানান, দলীয় রাজনীতিমুক্ত পরিবেশে সুন্নতে নববীর পূর্ণ অনুসরণ এবং আউলিয়ায়ে কেরামের অনুসৃত আদর্শকে ধারণ করে পরিচালিত এ প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ১৭ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে।
