পুলিশের অপকর্ম ঢাকতে ভুক্তভোগীদের হুমকি
এম এ কাউসার, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কিছু পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ দেওয়া ভুক্তভোগীরা নিরাপত্তা-শঙ্কায় দিন পার করছেন বলে জানা গেছে। ভুক্তভোগীরা জানান, প্রথমদিকে তারা বিচার পাওয়ার আশায় সোচ্চার থাকলেও এখন আর সে আশা নেই।
অভিযুক্ত পুুলিশ সদস্যের হুমকির কারণে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছেন। এ ধরনের ঘটনায় সাক্ষীদেরও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে অভিযুক্তদের অপকর্ম প্রমাণ করতে বেগ পেতে হচ্ছে পুলিশের ইন্টারনাল ওভারসাইট (পিআইও) ইউনিটকে। কেবল তা-ই নয়, এ ধরনের ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে থানায় জিডি করেও আইনি প্রতিকার মিলছে না। যুগান্তরের হাতে আসা একাধিক জিডি যাচাই করে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
২০ সেপ্টেম্বর যুগান্তরে ‘ইয়াবা পাচারে কোস্টার বাস : চট্টগ্রামে আটকের ৪ ঘণ্টা পর ডিবির তল্লাশি নাটক’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, ৪ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা ৬ মিনিটে কর্ণফুলীর পটিয়া ক্রসিং এলাকার আমিন উল্লাহ ট্রেডিং করপোরেশন ফিলিং স্টেশনে নিয়ে একটি কোস্টার বাসে তল্লাশি চালায় ডিবি। ১২টা ২৩ মিনিটের দিকে বাস থেকে ইয়াবার চালান সরিয়ে নেয় তারা। তবে এ ঘটনার মামলায় উল্লেখ করা হয় ‘মনগড়া’ তথ্য।
এতে বলা হয়, ওইদিন রাত ৩টা ৫০ মিনিটের দিকে কোতোয়ালি থানাধীন ফিরিঙ্গী বাজার থেকে নতুন ব্রিজগামী মেরিন ড্রাইভ রোডের আনসার ডিউটি শেডের বিপরীতে অস্থায়ী চেকপোস্টে বাসটিকে আটক করা হয় এবং চার হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার হয়। এ নিয়ে যুগান্তরে প্রতিবেদন প্রকাশের দিনই সিএমপির ডিসি-পিওএম মোহাম্মদ বদিউজ্জামানকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করে কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। পরদিন ২১ সেপ্টেম্বর থেকে তদন্ত শুরু হয়।
সূত্র জানায়, ডিবির উত্তর বিভাগের অভিযানের সময় ওই ফিলিং স্টেশনে নজেল ম্যান হিসাবে কর্মরত ছিলেন কায়েছ আহমদ। গত ৫ অক্টোবর তাকে জেরা করে তদন্ত কমিটি। এরপর থেকে নানাভাবে তাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন। ২৪ অক্টোবর সকালে তাকে ওই ফিলিং স্টেশনে খুঁজতে আসেন তিনজন। তখন আতঙ্কিত সবাই বলেন, কায়েছকে আমরা চিনি না। এরপর তারা চলে যান। এ ঘটনায় বুধবার কর্ণফুলী থানায় জিডি করেছেন কায়েছ আহমদ।
কায়েছ বলেন, ফিলিং স্টেশনে ইয়াবা উদ্ধারের সময় আমি কী দেখেছি, তা জানতে চেয়ে নোটিশ দিয়েছিল পুলিশ। মুনসুরাবাদ গিয়ে আমি জবানবন্দি দিয়েছি। এরপর থেকে অজ্ঞাত লোকজন আমাকে খুঁজছে। বর্তমানে আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। ওই ফিলিং স্টেশনের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জানা যায়, ওইদিন খুঁজতে আসা ওই তিনজন হলেন-সিএমপির ডিবি-উত্তর বিভাগের এসআই কাজী আবদুল মালেক এবং ডিবির সোর্স হিসাবে পরিচিত রাজিব দাশ ও সোহেল রানা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই কাজী আবদুল মাকেলকে ফোন করা হলে তিনি গাড়িতে আছেন জানিয়ে সংযোগ কেটে দেন। পরে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি আর রিসিভ করেননি। এর আগে ৯ সেপ্টেম্বর যুগান্তরে ‘সিএমপির এলআইসি শাখার এসি শরীফুল : যুবককে জিম্মি করে নিলেন ২০ লাখ টাকা’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। ঘটনাটি ঘটে ৪ সেপ্টেম্বর। ওই দিন নগরীর হালিশহরের ‘কে-ব্লক’ এলাকা থেকে ডিবি পরিচয়ে মো. আক্তারুজ্জামান শাকিল ও তার বন্ধু মো. মুনসুরকে তুলে সিএমপি কার্যালয়ে নিয়ে যান এসি শরীফুল ও দুই এএসআই।
ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর একইভাবে সিএমপির ডিসি-পিওএম মোহাম্মদ বদিউজ্জামানকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। জবানবন্দি নেওয়ার জন্য ১৪ সেপ্টেম্বর মুনসুরাবাদ ডিসি-পিওএম কার্যালয়ে ভুক্তভোগী শাকিলকে ডাকে তদন্ত কমিটি। সেখানে অপেক্ষমাণ অবস্থায় দেখতে পেয়ে নানা ধরনের হুমকি দেন অভিযুক্ত এএসআই মো. বাছির উদ্দিন। একই দিন ওই ঘটনায় নগরীর ডবলমুরিং থানায় জিডি করেন শাকিল। এরপর থেকে সাত দফায় নোটিশ দিয়েও শাকিলকে হাজির করতে পারেনি তদন্ত কমিটি।
এ প্রসঙ্গে অভিযুক্ত এএসআই বাছির উদ্দিন বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আপনার কাছ থেকে প্রথম জানলাম। এ বিষয়ে সিএমপির ডিসি-পিওএম মোহাম্মদ বদিউজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, ‘অপরাধে জড়িত পুলিশ সদস্যরা নানাভাবে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করবেন, এটা স্বাভাবিক। তবে পুলিশের অপরাধের ভুক্তভোগী বা ঘটনার সাক্ষীদের হুমকি দেওয়া হলে, তা পৃথক ফৌজদারি অপরাধ। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হবে।’
