কুমিল্লা সীমান্তের ১৩৪ পয়েন্ট দিয়ে ঢুকছে দেশে
অ্যাম্বুলেন্স কার কুরিয়ারে মাদক আসছে ঢাকায়
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি এড়াতে কৌশল বদলেছে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় মাদক সিন্ডিকেট। ভারতের ত্রিপুরা সীমান্ত থেকে বানের পানির মতো নেমে আসা মাদকের চালান কুমিল্লা হয়ে পৌঁছে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকায়। তল্লাশি এড়াতে জরুরি সেবার অ্যাম্বুলেন্স, দামি ব্যক্তিগত গাড়ি, নামিদামি কুরিয়ার সার্ভিস, লাশবাহী গাড়ি এবং নৌপথকে প্রধান মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করছে চক্রগুলো।
শুধু যানবাহনের বৈচিত্র্যই নয়, পাচারকারীরা ছদ্মবেশ ধারণেও এনেছে অভিনবত্ব। বিভিন্ন বয়সি নারী, লেবাসধারী মুসল্লি এবং ভুয়া পোশাকধারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সেজে অবাধে পাচার করা হচ্ছে ইয়াবা, স্কার্ফ, টাপেন্টাডল, বিদেশি মদ ও গাঁজার বিশাল চালান।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুমিল্লা জেলার ৫টি সীমান্তঘেঁষা উপজেলার (সদর দক্ষিণ, আদর্শ সদর, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া ও চৌদ্দগ্রাম) সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারতের প্রায় ১০৩ কিলোমিটার সীমান্ত বিস্তৃত। এসব সীমান্তে আন্তর্জাতিক চোরাকারবারিদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী মাদক নেটওয়ার্ক। সীমান্তের অন্তত ১৩৪টি পয়েন্ট দিয়ে অবাধে দেশে ঢোকানো হচ্ছে মাদক। সীমান্তের এই ১৩৪টি পয়েন্ট দিয়ে আসা চালানের সিংহভাগই সরবরাহ করা হচ্ছে ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকাগুলোতে।
রাজধানীর অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে অলিগলির মাদকের বাজারে এখন সবচেয়ে বড় চাহিদা কুমিল্লার সীমান্ত দিয়ে আসা চালানের। ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে সীমান্ত থেকে মাত্র দেড়-দুই ঘণ্টার মধ্যে নিরাপদ ট্রানজিট হিসাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ব্যবহার করে ঢাকার সিন্ডিকেটের হাতে মাদক পৌঁছে যাচ্ছে।
সম্প্রতি এসআরবি, ডিবি পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বেশকিছু অভিযানে পাচারকারীদের নতুন রূপ উন্মোচিত হয়েছে।
অ্যাম্বুলেন্স ও লাশবাহী গাড়ি জরুরি রোগী কিংবা লাশ বহনের সুবিধাকে সুযোগ হিসাবে নিচ্ছে তারা। ভণ্ড রোগী শুইয়ে রেখে সাইরেন বাজিয়ে মহাসড়কে পুলিশের চেকপোস্ট এড়িয়ে দ্রুত ঢাকায় ঢুকছে অ্যাম্বুলেন্স। কুরিয়ার সার্ভিসে পার্সেল বা বিভিন্ন মালামালের আড়ালে বুকিং দিয়ে ঢাকার বিভিন্ন শাখায় পাঠানো হচ্ছে ফেনসিডিল ও ইয়াবার বড় চালান। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তল্লাশি এড়াতে নারীদের গর্ভবতী কিংবা যাত্রী সাজিয়ে দেহে বা ব্যাগে মাদক বহন করানো হচ্ছে। ধর্মীয় পোশাকে মুসল্লি এবং ভুয়া পুলিশ বা ডিবি পরিচয় দিয়ে যাতায়াত করছে কিছু সদস্য।
সীমান্ত লাগোয়া নদী বা খাল পেরিয়ে ট্রলার ও নৌকায় মাদক নামানোর পর তা তোলা হচ্ছে ব্যক্তিগত দামি গাড়ি ও মাইক্রোবাসে। সম্প্রতি দাউদকান্দি টোল প্লাজায় বেশ কয়েকটি আ্যম্বুলেন্স এবং কুরিয়ার সার্ভিস থেকে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করেছে পুলিশ। কুমিল্লা ডিবি পুলিশের অভিযানে কুরিয়ার সার্ভিস ব্যক্তিগত গাড়ি এবং আ্যম্বুলেন্সে ইয়াবা বহনকালে গত কয়েক মাসে প্রায় ৬০ কোটি টাকার ইয়াবা ধরা পড়েছে। তাছাড়া জেলার বিভিন্ন থানা পুলিশের অভিযানে প্রতিদিনই মাদকদ্রব্য পাচারকালে বিপুলসংখ্যক নারী মাদক পাচারকারী গ্রেফতার হচ্ছে। তবে লজিস্টিক সাপোর্ট না থাকায় নৌপথে মাদক ধরতে পারছে না জেলার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
কুমিল্লার দাউদকান্দি থানার ওসি সাজেদুল ইসলাম বলেন, আমরা এর আগে অভিযান চালিয়ে অ্যাম্বুলেন্স কুরিয়ার সার্ভিস এবং ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে কয়েক কোটি টাকার মাদক আটক করেছি। তাছাড়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিনব কায়দায় পাচারকালে নারী মাদক কারবারিদেরও আটক করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা সনাতন পদ্ধতিতে সোর্সের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এসব মাদক আটক করছি। তবে আমাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বহু মাদক ঢাকায় প্রবেশ করছে।
কুমিল্লা ডিবির ওসি শামসুল আলম শাহ বলেন, কক্সবাজার থেকে কুরিয়ার সার্ভিস, আ্যম্বুলেন্স এবং ব্যক্তিগত গাড়িযোগে শত শত কোটি টাকার ইয়াবা ঢাকায় পাচার হচ্ছে। এর আগে আমরা প্রায় ৬০ কোটি টাকার ইয়াবা আটক করেছি। যেসব মাদকের চালানের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় সেগুলোই আমরা আটক করতে পারি। যেগুলোর তথ্য পাই না সেগুলো নিরাপদে ঢাকায় পৌঁছে যায়। তিনি আরও বলেন, মাদক সিন্ডিকেটের ছদ্মবেশ ও অভিনব কৌশল ভেস্তে দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

