খুলশীতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার অপরাধ সাম্রাজ্য
চট্টগ্রাম ব্যুরো
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রাম নগরীর অভিজাত খুলশী থানা এলাকায় অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা শাহ আলম। তার বিরুদ্ধে কিশোর গ্যাং সদস্যদের দিয়ে সরকারি জমি দখল, রেলওয়ের কোয়ার্টার দখল, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, জুয়ার বোর্ড পরিচালনাসহ নানা অপকর্ম করার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা ভয়ে এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে পারছেন না। অভিযোগ রয়েছে, শাহ আলমের সঙ্গে পুলিশের কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার খাতির রয়েছে। এ কারণে পুলিশের কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়ার সাহস পান না ভুক্তভোগীরা। শাহ আলম এলাকায় ‘ফার্নিচার শাহ আলম’ হিসাবে পরিচিত। এই এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী ওয়াকিল হোসেন বগা কারাগারে যাওয়ার পর থেকে তার আধিপত্য বেড়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন শাহ আলম। ওই বছরের ২৬ অক্টোবর এলাকায় চাঁদাবাজি, দখল ও আধিপত্য বিস্তারের জেরে সংঘর্ষে জড়ায় খুলশী থানা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক এবং থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহ আলমের অনুসারীরা। ওমর ফারুক নগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক এসকে খোদা তোতনের অনুসারী। ওইদিন সন্ধ্যায় সেগুনবাগান এলাকায় দুপক্ষের মধ্যে কয়েক দফায় সংঘর্ষ হয়। পরদিন এসকে খোদা তোতন ও শাহ আলমকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। সর্বশেষ গত শনিবার রাতে খুলশী থানাধীন সেগুনবাগান এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের
জেরে শাহ আলম ও খুলশী থানা যুবদলের আহ্বায়ক হেলাল হোসেন ওরফে পিচ্চি হেলালের অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে খুলশী থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য মো. মুরাদ ও সেগুনবাগান এলাকার মো. জাহাঙ্গীরের ছেলে মো. আলমগীর গুরুতর আহত হন। এর মধ্যে মুরাদ শাহ আলমের এবং আলমগীর পিচ্চি হেলালের অনুসারী।
মাদকাসক্ত বানিয়ে গ্যাং গ্রুপ : কিশোর ও তরুণদের প্রথমে ইয়াবায় আসক্ত বানিয়ে তাদের দিয়ে ‘কিশোর গ্যাং’ গড়ে তুলেছে শাহ আলম। জানা গেছে, খুলশী থানাধীন এলাকায় এমন একাধিক গ্রুপ রয়েছে। এদের মধ্যে অন্যতম সদস্যরা হলেন-আপ্পি, মুরাদ, সোহেল ওরফে গেটকিপার সোহেল, মোজাম্মেল, আরিফ, রুবেল ওরফে শ্বেত রুবেল। তাদের সঙ্গে শতাধিক সশস্ত্র সদস্য রয়েছে। তারা খুলশী থানাধীন ডিজেল কলোনি, ঝাউতলা বাজারসংলগ্ন জলদাখানা, সেগুনবাগান ও ঝাউতলা স্টেশনে আস্তানা গড়ে তুলেছে। ডিজেল কলোনি এলাকায় রেলের অসংখ্য কোয়ার্টার দখল করে নানা ধরনের অপকর্ম করছে এই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। এছাড়া অটোরিকশা গ্যারেজে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ, পানির ব্যবসা, জুয়ার আসর পরিচালনা ও খুলশী এলাকায় ভিআইপি পতিতা ব্যবসাও তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে। সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত বাস্তুহারা বস্তিসংলগ্ন আটতলা ভবনে চলে শাহ আলমের ইয়াবাসেবন ও অপরাধ কর্মকাণ্ডের আসর। এছাড়া যুবলীগের ডাকাত মিজান, আঙুলকাটা আলী, বাবুল এবং রেলওয়ের টেন্ডারবাজ আমজাদ বাহিনী শাহ আলমের ছত্রছায়ায় অপরাধের বিস্তার ঘটাচ্ছে।
মাসোহারা পেয়ে নীরব পুলিশ : স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খুলশী এলাকায় মসজিদের ইমাম, চিকিৎসক কিংবা বিএনপি নেতার ছেলে কেউই শাহ আলমের হাত থেকে রক্ষা পাননি। মাদক, পতিতা ও জুয়ার বোর্ড থেকে পাওয়া টাকার একটি অংশ মাসোয়ারা হিসাবে থানায় দেওয়ায় নীরব ভূমিকা পালন করছে পুলিশ। এছাড়া জাকির হোসেন রোডের হলিক্রিসেন্ট হাসপাতালের মূল্যবান মালামাল লুটপাট এবং পোর্ট সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও শাহ আলমের নাম এসেছিল। তবে প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় তিনি মামলা থেকে রেহাই পান।
আধিপত্য বিস্তারে মরিয়া : চব্বিশের ৫ আগস্টের পর খুলশী এলাকায় বিভিন্ন সময় বিএনপি নেতা তোতন, যুবদল নেতা হেলাল আধিপত্য বিস্তার করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা ওয়াকিল হোসেন বগা ও শাহ আলমের কারণে তারা সুবিধা করতে পারেননি। সম্প্রতি চাঁদাবাজির একটি মামলায় আত্মসমর্পণের পর আদালতের নির্দেশে বগাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এরপর থেকে তোতন ও হেলাল গ্রুপ আধিপত্য বিস্তার করার চেষ্টা করছে। তবে এককভাবে শাহ আলমের সঙ্গে পেরে উঠতে পারছে না তারা। অভিযোগের বিষয়ে জানার জন্য শাহ আলমের মোবাইল ফোনে মঙ্গল ও বুধবার একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। ক্ষুদে বার্তা পাঠানোর পরও সাড়া মেলেনি। খুলশী থানার ওসি মোহাম্মদ কামরুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, ‘শনিবার দুই গ্রুপে মারামারির ঘটনায় মামলা হয়েছে। খুলশী এলাকায় একাধিক গ্রুপ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত। কে কোন দল করে তা বিবেচ্য বিষয় নয়। অপরাধী যেই হোক, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি। শাহ আলমের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পাইনি।’
