কাজে যোগ দিয়েছেন শ্রমিকরা
ছুটির দিনেও সচল ছিল পোশাকশিল্প
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কয়েক দিনের টানা আন্দোলন, শ্রমিক অসন্তোষ এবং দফায় দফায় সংঘর্ষের পর অবশেষে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে শুরু করেছে দেশের গার্মেন্টস শিল্পাঞ্চলগুলো। কঠোর নিরাপত্তার মাঝে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের কারখানাগুলোতে শুক্রবার ছুটির দিনেও উৎপাদন চলেছে। পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত ছিল। শিল্প পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এবং কারখানাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিল্প এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারির মধ্যে সকাল থেকেই দল বেঁধে শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে কারখানায় প্রবেশ করতে দেখা যায়। কোনো ধরনের বাধা বা বিশৃঙ্খলা ছাড়াই নির্ধারিত সময়ে শুরু হয় উৎপাদন কার্যক্রম। তবে ছুটির দিন থাকায় অনেক কারখানা বন্ধ ছিল। তৈরি পোশাকশিল্প সূত্র জানায়, কয়েক দিনের আন্দোলনে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ক্ষতি পুষিয়ে নিতে শুক্রবার অনেক কারখানা খোলা রাখা হয়। যুগান্তর স্টাফ রিপোর্টার ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
গাজীপুরে শান্ত শিল্পাঞ্চল, ৩০ শতাংশ কারখানায় উৎপাদন : টানা কয়েক দিনের শ্রমিক অসন্তোষ, মহাসড়ক অবরোধ, সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনার পর শিল্পাঞ্চল গাজীপুরের পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত। শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে জেলার প্রায় ৭০ থেকে ৭২ শতাংশ পোশাক কারখানা বন্ধ ছিল। বাকি কারখানাগুলোর মধ্যে যেসব প্রতিষ্ঠানে উৎপাদনের চাপ বেশি, সেগুলোতে কাজ চলেছে। কোথাও শ্রমিক বিক্ষোভ কিংবা অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। মহাসড়কেও যান চলাচল ছিল স্বাভাবিক। তবে পরিস্থিতি শান্ত হলেও পুরোপুরি স্বস্তিতে ফিরতে পারেননি শিল্পসংশ্লিষ্টরা। গত কয়েক দিনের সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, মহাসড়ক অবরোধে পোশাক কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পরিবহণ ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য।
শুক্রবার সকালে কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা ও চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক। আগের কয়েক দিনের মতো শ্রমিকদের জটলা, বিক্ষোভ কিংবা মহাসড়কে অবস্থান নেওয়ার ঘটনা নেই। শিল্পাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে দেখা গেছে। একই চিত্র দেখা গেছে গাজীপুর মহানগরের ভোগড়া ও নাওজোড় এলাকায়। কোথাও শ্রমিকদের সড়কে অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসাইন বলেন, শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় জেলার ৭০ থেকে ৭২ শতাংশ কারখানা বন্ধ রয়েছে। যেসব কারখানায় কাজের চাপ বেশি, সেগুলো খোলা রেখে উৎপাদন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা বা শ্রমিক বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়নি। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আগের মতোই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মোতায়েন রয়েছেন।
কালিয়াকৈরে ছুটির দিনেও কাজ : গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলা ও পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় সাত দিন ধরে চলা শ্রমিক বিক্ষোভ বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে। শুক্রবার থেকেই কারখানায় কাজ চলছে। কারখানার স্থগিত হওয়া শিপমেন্ট রক্ষা করতে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে শ্রমিকরা কাজ করেছেন। এলাকার সব কারখানা চালু না হলেও বেশ কিছু কারখানা চালু থাকায় শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ ফিরে এসেছে। তবে রোববার থেকে কালিয়াকৈর এলাকার সব কারখানা পুরোদমে চালু হবে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। জানা যায়, উপজেলা প্রশাসন, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর শ্রমের ফলে কালিয়াকৈরে অশান্ত পরিবেশ শান্ত হয়েছে। বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও মাঠে থেকে শিল্প রক্ষায় ভূমিকা রেখেছেন।
শুক্রবার পৌরসভার হরতকিতলা এলাকায় অবস্থিত ইকোটেক্স (সমাহার) এবং কালামপুর এলাকার এপেক্স কারখানা খোলা ছিল। শ্রমিকরা সকাল থেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কারখানায় যোগ দিয়ে নির্ধারিত শিপমেন্টের কাজ করেছেন। এপেক্স হোল্ডিংস আশপাশের বেশ কিছু কারখানায়ও কাজ হয়েছে। অনেক কারখানায় সাপ্তাহিক ছুটি ও পূর্বেই কারখানা বন্ধের ঘোষণা থাকায় বন্ধ ছিল। অপর দিকে অনেক কারখানায় ৭ নভেম্বর ছুটি থাকায় শুক্রবার বন্ধের দিন কারখানার চাকা ঘুরেছে।
শুক্রবার সফিপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জুমার নামাজের সময় মসজিদের ইমাম বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির প্রতি আমাদের সমর্থন রয়েছে। কিন্তু দাবি আদায়ের নামে ভাঙচুর-বিক্ষোভ-সড়ক অবরোধ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কারখানা বন্ধ হলে মসজিদ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ঘরভাড়া, অফিস-আদালত সব কিছুতেই সমস্যা হবে। এলাকায় অর্থনৈতিক সমস্যা বিরাজ করবে। সবাইকে কারখানার নিরাপত্তা ও শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির প্রতি শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করতে হবে। এদিকে কালিয়াকৈর থানা পুলিশ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী ইউসুফ কবির (৪২) এবং নুরুল আমীনকে (৪০) গ্রেফতার করেছে।
সাভার-আশুলিয়ায় ৮০ শতাংশ শ্রমিকের কাজে যোগদান : টানা পাঁচ দিনের শ্রমিক আন্দোলন ও উত্তেজনার পর সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে পরিস্থিতি। খুলে দেওয়া হয়েছে অধিকাংশ তৈরি পোশাক কারখানা। শুক্রবার ছুটির দিন থাকলেও বেশ কিছু কারখানায় শ্রমিকরা কাজে যোগ দিয়েছেন। সকাল থেকেই সাভারের হেমায়েতপুর, উলাইল, পদ্মার মোড় এবং আশুলিয়ার নরসিংহপুর, বাইপাইল, জিরাবো, পুকুরপাড় এলাকায় শ্রমিকরা সারিবদ্ধভাবে কারখানায় যোগ দেন। এ সময় সিকিউরিটি গার্ড তাদের আইডি কার্ড চেক করেন। পাশাপাশি পুলিশের নজরদারিও ছিল। বিভিন্ন কারখানার এইচআর ডিপার্টমেন্ট সূত্র জানায়, ৮০ শতাংশ শ্রমিক কাজে যোগদান করেছেন। তারা বলেন, ছুটির দিন হওয়ায় এই উপস্থিত। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে শনিবার উপস্থিতি শতভাগ হবে বলে আশা করা যায়।
সকালে ঢাকা-আরিচা ও আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত বেশ কিছু পোশাক কারখানা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে খুলে দেয় কর্তৃপক্ষ। এ সময় শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর্মস্থলে যোগ দিতে দেখা যায়। কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। ঢাকা-আরিচা ও বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর মহাসড়কে যান চলাচলও স্বাভাবিক ছিল।
কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে শিল্পাঞ্চলে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুলিশের পাশাপাশি মোতায়েন রয়েছেন বিজিবির ১৩ প্লাটুন সদস্য। এছাড়া দায়িত্ব পালন করছেন আটজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। আশুলিয়া শিল্প পুলিশের এসপি মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, বিগত কয়েক দিন যা ঘটেছে তা শ্রমিক আন্দোলন নয়। বরং ফ্যাসিস্টরা তাদের ব্যর্থ শক্তি প্রদর্শন করে এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে আন্দোলনের মাধ্যমে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। অতীতেও তারা পুলিশকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে এবং পুলিশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠনের পর ঢাকার শিল্পাঞ্চল আশুলিয়াসহ আশপাশের শ্রমিকদের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। টানা শ্রমিক অসন্তোষের পর শিল্পাঞ্চলে এখন শান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে।
গার্মেন্টস শ্রমিক হত্যার বিচার ও আটকদের মুক্তি দাবি : গার্মেন্টস শ্রমিক তৌফিক হত্যার বিচার, শ্রমিক নেত্রী ও মানবাধিকার কর্মী রোজিনা আক্তার সুমিসহ গ্রেফতার সব শ্রমিক নেতার নিঃশর্ত মুক্তি এবং তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে। শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে গ্রিন বাংলা গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশন আয়োজিত প্রতিবাদী সমাবেশে এই দাবি জানান তারা। সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়।
সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও এশিয়া ফ্লোর এলায়েন্স-বাংলাদেশ-এর সদস্য সচিব মোসা. সুলতানা বেগমের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মো. ইলিয়াস, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ফরিদ উদ্দীন, দপ্তর সম্পাদক ও নারী কমিটির সাধারণ সম্পাদক আমরিন হোসাইন এ্যানি প্রমুখ। সমাবেশ থেকে চার দফা দাবি জানানো হয়। এগুলো হলো-গার্মেন্টস শ্রমিক তৌফিক হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে; শ্রমিক নেত্রী ও মানবাধিকার কর্মী রোজিনা আক্তার সুমিসহ গ্রেফতার সব শ্রমিক ও শ্রমিক নেতার নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে; শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দায়ের করা হয়রানিমূলক ও ষড়যন্ত্রমূলক সব মামলা প্রত্যাহার করতে হবে এবং শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার আদায়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বাধা, পুলিশি হয়রানি ও দমন-পীড়ন চিরতরে বন্ধ করতে হবে।
ফতুল্লায় ৪২ জনের নামে মামলা, গ্রেফতার ১ : নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার কাঠেরপুর এলাকায় শ্রমিকের সাথে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনায় ৪২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ থেকে ৩০০ জনকে আসামি করে মামলা করেছে পুলিশ। ফতুল্লা মডেল থানার এসআই শহিদুল ইসলাম বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার রাতে মামলাটি করেন। এ মামলায় শিবু (৪২) নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
মামলার এজাহারনামীয় আসামিদের মধ্যে রয়েছেন-শ্রমিক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কাউসার আহমেদ পলাশ ও শাহাদাত হোসেন সেন্টু, জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি টিপু সুলতান, যুবলীগ নেতা আজমত আলী, মোফাজ্জল হোসেন চুন্নু ও ওয়াসিম, আওয়ামী লীগ নেতা মজিবর এবং ছাত্রলীগ নেতা সোহাগ ও সেলিম। এছাড়া কুতুবপুর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে উল্লেখিত মিরু হোসেন ওরফে ল্যাংড়া মিরু, রঞ্জিত মণ্ডল, সাবেক জেলা আওয়ামী লীগ নেতা ইব্রাহীম চেঙ্গিস ওরফে চেঙ্গিস খান, ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের নেতা অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান, জেলা কৃষক লীগের সভাপতি নাজিম উদ্দীন সরদার, ফতুল্লা থানা ছাত্রলীগের সভাপতি আবু শরিফুল হক, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শামীম, ইমরান হোসেন শুভ ওরফে চান শুভ এবং আল আমিন কবিরের নাম রয়েছে। তালিকায় আরও রয়েছেন জাকারিয়া জাকির ওরফে জাকির মেম্বার, রতন, রাকিব, শাহ নিজামের সহযোগী রাজ্জাক। এছাড়া বিভিন্ন ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ের আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের আসামি করা হয়েছে।
