কেজিতে লোকসান ১১ টাকা
পুঁজি হারিয়ে সর্বস্বান্ত আলুচাষি-ব্যবসায়ীরা
আনু মোস্তফা, রাজশাহী
প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজশাহী অঞ্চলে আগাম আলু উঠবে আর মাসখানেকের মধ্যেই। অথচ এ অঞ্চলের হিমাগারগুলোতে এখনো আগের বছরের অর্ধেকের বেশি আলু অবিক্রীত রয়েছে। এ নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা। একদিকে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে হিমাগারগুলো খালির নোটিশ দিয়েছেন মালিকরা। জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে সেগুলো প্রস্তুত করতে হবে আগামী মৌসুমের আলুর জন্য। অন্যদিকে বাজারে বর্তমানে আলুর পাইকারি দাম খুবই কম-১২ থেকে ১৪ টাকা। অথচ আলু উৎপাদন ও হিমাগার ভাড়াসহ সব মিলিয়ে কেজিতে খরচ হয়েছে ২২ থেকে ২৫ টাকা। এতে প্রতি কেজিতে ১১ টাকার মতো লোকসান হচ্ছে তাদের। এভাবে রাজশাহীর হাজারো কৃষক ও ব্যবসায়ী পুঁজি হারাচ্ছেন।
জানা যায়, রাজশাহীতে বর্তমানে খুচরা বাজারে আলুর কেজি ১৫ থেকে ২০ টাকা। পাইকারি বাজারে আলুর দাম ১২ থেকে ১৪ টাকা। বাজারে চাহিদা ও দাম কম থাকায় চাষি ও ব্যবসায়ীরা আলু বের করছেন না হিমাগার থেকে।
রাজশাহী হিমাগার মালিক সমিতি সূত্র জানায়, এই জেলায় ৩৬টি হিমাগারে ৮০ লাখ বস্তায় প্রায় সাড়ে ৬ লাখ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে অর্ধেকের মতো বের করা হয়েছে। বাকি আলুর তিন ভাগের এক ভাগ বীজ আলু হিসাবে ব্যবহৃত হবে। যার মানে এখনো ১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন আলু অবিক্রীত রয়েছে। এদিকে আগামী এক দেড় মাসের মধ্যে আগামজাতের নতুন আলু উঠতে শুরু করবে। তখন পুরোনো আলু বেতন বিক্রি হবে না।
মোহনপুর উপজেলার বসন্তকেদার গ্রামের আলু চাষি শেখ মবিনুর রহমান জানান, তিনি পবা উপজেলার উত্তরা স্টোরে ২৫০ বস্তা আলু রেখেছিলেন। প্রতি কেজি আলু উৎপাদন ও হিমাগারে নেওয়া পর্যন্ত প্রতি কেজিতে খরচ হয়েছিল ২২ থেকে ২৫ টাকা। এখন পাইকারি বাজারে প্রতি কেজির দাম ১২ থেকে ১৪ টাকা। গড়ে কেজিতে লোকসান ১১ টাকা। এই দরে আলু বেচে হিমাগার ভাড়া মেটানো যাচ্ছে না।
শেখ মবিন আরও বলেন, আমারতো হাজার হাজার আলু চাষির সামনে এমন উভয় সংকট। আলু ছাড়ালেও বিপদ আবার হিমাগারে রাখলেও বিপদ। না তুললে হিমাগার মালিক নিলামে বেচে ভাড়া উসুল করবেন।
রাজশাহীর হিমাগার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান জানিয়েছেন, চাষি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ৩০ নভেম্বর সময় পর্যন্ত আলু রাখার নিয়ম। কিন্তু আলুর বাজার পরিস্থিতি ও চাষিদের দুরাবস্থার কথা ভেবে হয়তো আরও কিছুদিন রাখতে হবে। তবে ডিসেম্বরের মধ্যে হিমাগার খালি করতে হবে। গত বছর হিমাগারের পক্ষ থেকে আলু খালাস করার জন্য মাইকিং করা হয়েছিল। পরিস্থিতি তেমন হলে এবারও নোটিশ দিয়ে পরে মাইকিং করা হবে।
রাজশাহীর বায়া এলাকার আলু ব্যবসায়ী হেলাল উদ্দিন বলেন, খুব বেশি হলে আর এক মাস সময় পাওয়া যাবে আলু হিমাগার থেকে তোলার জন্য। কিন্তু মাত্র এক মাসের মধ্যে বিপুল পরিমাণ আলু কীভাবে কোথায় বিক্রি করব, সেটাই বড় প্রশ্ন। তিনি আরও জানান, আমরা যে পরিমাণ আলু সংরক্ষণ করেছি তার ৬০ ভাগ এখনো হিমাগারেই রয়েছে। আলু খালাস করে উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, হিমাগার ভাড়াই হচ্ছে না।
বায়ার আসমা হিমাগারের ব্যবস্থাপক আলী আশরাফ হোসেন জানান, নোটিশ দেওয়ার পরও চাষিরা আলু তুলছেন না। ৩০ ডিসেম্বরের পর আলু আর রাখা যাবে না। চাষিরা না তুললে আমরা নিলামে আলু বেচে ভাড়ার টাকা উঠিয়ে নেব।
অন্যদিকে আলুর বর্তমান বাজারমূল্য নিয়ে চরম বিড়ম্বনার কথা জানিয়ে রাজশাহী জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, গত দুই মৌসুমে রাজশাহীর আলু চাষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এবারও চাষিরা বিপুল লোকসানে পড়েছেন, আলু কিনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। পথে বসেছেন রাজশাহীর হাজার হাজার চাষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। এই দামে আলু বেচে কোনোভাবেই খরচ তোলা সম্ভব নয়। অনেকেই আর আলু চাষ না করার কথাই ভাবছেন। সরকার অনেক কিছু নিয়ে ভাবে কিন্তু আলু চাষিদের এই দুর্দশা লাঘবে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
