যশোরে ভ্যানিলা চাষ
দামি মসলায় সম্ভাবনার দুয়ার
তৌহিদ জামান, যশোর
প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কৃষি উদ্যোক্তা সরোয়ার হোসেনের খেতে এখন চকচক করছে মসলাজাতীয় পণ্য ভ্যানিলার বীজ। এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মসলাজাতীয় ফল। যা কেক, বিস্কুট, মাফিন ও পেস্ট্রির পাশাপাশি আইসক্রিম, দই, কাস্টার্ড, চকলেট, সুগন্ধি, প্রসাধনী ও ওষুধশিল্পে ব্যবহৃত হয়। তবে ভ্যানিলার স্বাদযুক্ত সব পণ্যেই প্রাকৃতিক বিন ব্যবহার করা হয় না। কৃত্রিম ভ্যানিলাই বেশি ব্যবহৃত হয়। সরোয়ার হোসেনই প্রথম যশোরে বাণিজ্যিকভাবে ভ্যানিলা চাষ করছেন বলে তার দাবি।
ভ্যানিলা মূলত একটি লতানো অর্কিডজাতীয় গাছের ফল, যা ভ্যানিলা বীজ (বিন) বা ভ্যানিলা ফল নামেও পরিচিত। কাঁচা ভ্যানিলা ফলে নিজস্ব কোনো সুবাস থাকে না। এগুলো পরিপক্ব হলে গাছ থেকে সংগ্রহ করে দীর্ঘ সময় ধরে প্রক্রিয়া করা হয়। এরপর বিশেষ সেই ঘ্রাণ তৈরি এবং সেখান থেকে ভ্যানিলা নির্যাস সংগ্রহ করা হয়।
কৃষি উদ্যোক্তা সরোয়ার হোসেন যশোরের চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুর ইউনিয়নের স্বর্পরাজপুর গ্রামের বাসিন্দা। ফলের বাগান করছেন দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে। প্রথমদিকে তিনি ১৩ বিঘা জমিতে আমের বাগান করেন। এরপর ড্রাগন। দুই বছর আগে রামবুটানের চারা রোপণ করেন। রয়েছে পেঁপে বাগানও।
২০২২ সালে তিনি ৫ কাঠা জমিতে ভ্যানিলা চাষ করেন। প্রথমবার ৫০টি চারা রোপণ করেন, যার মধ্যে ১৩টি মারা যায়। চার ধাপে চাষ করা ভ্যানিলার বর্তমানে গাছ রয়েছে ১৬৫টি। যার মধ্যে ১৭টি গাছে ফল বা বিন এসেছে। সরোয়ার হোসেন বলেন, এই অঞ্চলে নজরুল ইসলাম প্রথম পরীক্ষামূলক ভ্যানিলার চারা রোপণ করেন। তার সঙ্গে আলাপ করে ভ্যানিলা চাষ শুরু করি। তিনিই আমাকে প্রথমদিকে অল্প চারা দিয়ে শুরুর পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, সারা বিশ্বে শেড ও বাগান পদ্ধতিতে ভ্যানিলা চাষ হয়। শেড পদ্ধতিতে খরচ দ্বিগুণ। পরীক্ষামূলক বাগানে এই চাষ করে সফল হয়েছি।
তিনি জানান, দেশে হাজার হাজার বিঘা ছায়াযুক্ত পতিত জমি (আম, কাঁঠাল, জাম, সুপারি, মেহগনির বাগান) রয়েছে। সেখানে ভ্যানিলা চাষ করা সম্ভব। কেননা এই প্রজাতি আধো ছায়া আধো আলোযুক্ত স্থানে বিশেষ করে যেখানে আর্দ্রতা বেশি সেখানে ভালো হয়।
তার মতে, বাংলাদেশে ভ্যানিলা হবে না-এ রকম কোনো জায়গা নেই। এখন দরকার উৎপাদন বাড়ানো। দেশে যদি ১০০ কৃষককে প্রয়োজনীয় ভ্যানিলা কাটিং দেওয়া হয়, তাহলে চার থেকে পাঁচ বছর পর এক হাজার কেজি ভ্যানিলা বিন রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব। তখন আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশে আসতে শুরু করবে। প্রক্রিয়াজাত করার পর প্রতি কেজি ভ্যানিলা বিনের মূল্য দাঁড়ায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা।
ভ্যানিলা চারা (কাটিং) রোপণের দুই থেকে তিন বছর পরে গাছে ফুল আসে। ফুল ফুটে কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়। এই সময়ের মধ্যে পরাগায়ন করতে হয়। মার্চে ফুল এলে নভেম্বর-ডিসেম্বর নাগাদ ভ্যানিলা বিন হারভেস্ট করা যায়। সরোয়ার হোসেন জানান, তার খেতে এখন যে সংখ্যক ভ্যানিলা বিন রয়েছে, তাতে দুই কেজির মতো ভ্যানিলিন (ভ্যানিলার প্রধান সুগন্ধি যৌগ) পাওয়া যাবে।
এই অঞ্চলে ভ্যানিলা চাষ পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করেন ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার আজমপুর ইউনিয়নের গৌরীনাথপুর গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা নজরুল ইসলাম। তিনি সর্বপ্রথম ২০১৯ সালে ৫টি কাটিং দিয়ে শুরু করেন। তিনি জানান, জাফরানের পরেই বিশ্বে ভ্যানিলার কদর ও দাম রয়েছে। তিনি ছাড়াও চুয়াডাঙ্গার হুমায়ুন কবীর, সিলেটের আবুল খায়ের, পার্বত্য চট্টগ্রামের অ্যানি মং ও মাস্টার দাদা এবং বগুড়া মসলা গবেষণা ইনস্টিটিউটের ড. ফাহিম ফয়সল ভ্যানিলার চাষ করছেন।
মাগুরা আঞ্চলিক মসলা গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আশরাফুল আলম বলেন, ভ্যানিলা খুবই সম্ভাবনাময়। এর পরাগায়নে এক ধরনের মাছি কাজ করে। কিন্তু আমাদের দেশে সেই মাছি নেই। সে কারণে হাতেই পরাগায়ন করতে হচ্ছে। এখন দেখতে হবে, ভ্যানিলা ফলের উৎপাদন কেমন। উৎপাদন ভালো হলে আমরা প্রকৌশল বিভাগকে বিষয়টিতে সহযোগিতার জন্য বলতে পারব।
