খুলেছে বন্ধ জুট মিলগুলো
খুলনায় কর্মসংস্থানে নতুন দিগন্ত
খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত ৮টি জুট মিল বেসরকারি ইজারায় * নিউজপ্রিন্ট ও হার্ডবোর্ড মিলও চালু করতে নতুন উদ্যোগ
নূর ইসলাম রকি, খুলনা
প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
খুলনায় দীর্ঘদিন বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত জুট মিলগুলোর বেশির ভাগই খুলেছে। ইতোমধ্যে ৯টি রাষ্ট্রায়াত্ত মিলের মধ্যে ৮টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইজারা নিয়ে পুরোদমে কাজ শুরু করেছে। এর মধ্যে কয়েকটিতে উৎপাদন শুরু হয়েছে। বাকিগুলোয় সংস্কারকাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। মূলত বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর চলমান উদ্যোগকে আরও সমন্বিত উপায়ে ত্বরান্বিত করায় মিলগুলো দ্রুত খুলছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা খুলনা নিউজপ্রিন্ট ও হার্ডবোর্ড মিলও চালুর উদ্যোগ নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। সরকারের এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে নতুন করে এ অঞ্চলে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির আশা করা হচ্ছে।
শিল্পনগরী হিসাবে খ্যাত খুলনায় বিগত সরকারের আমলে সব মিল বন্ধ করে দেওয়ায় ৩০ হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে যান। অনেক শ্রমিকই খুলনা ছেড়ে নিজ গ্রামের বাড়ি চলে যান। আবার অনেকে বিকল্প পেশা হিসাবে রিকশা, ইজিবাইক, মুদি দোকানসহ দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কাজ করে দিন চালাচ্ছেন। সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ১১টি মিলের মধ্যে ৬টি মিল অবস্থিত খুলনার খালিশপুর থানায়। ১টি মিল দিঘলিয়ায় এবং অন্য ৪টি খানজাহান আলী থানা এলাকায়। ২০২০ সালের ১ জুলাই একযোগে এসব মিল বন্ধ করা হয়। এর আগে শিল্প মন্ত্রণালয়ের দুটি মিল ২০০২ সালের ৩০ নভেম্বর বন্ধ হয়। মিলগুলো বন্ধ হওয়ার পর বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) ৯টি মিলের আনুমানিক ২৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিককে এককালীন পাওনা পরিশোধ করে। তবে ১০ হাজারের মতো অস্থায়ী শ্রমিক তেমন সুবিধা পাননি।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর মিলগুলো চালুর উদ্যোগ জোরদার করে। বিজেএমসির তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি মিল ৩০ বছরের চুক্তিতে ইজারা দেওয়া হয়েছে। ইজারা নেওয়ার পর থেকে প্রথম ৩৬ মাস কোনো ভাড়া পরিশোধের প্রয়োজন নেই। তবে ২৪ মাসের অগ্রিম ভাড়া দিতে হবে। মিলগুলোয় পাটজাত পণ্যের পাশাপাশি অন্যান্য স্থাপনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে মিলগুলোয় আগে ছাঁটাই হওয়া এবং অভিজ্ঞ শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। সর্বোপরি পরিবেশবান্ধব ব্যবসাসহ বিজেএমসির তদারকি ও শর্ত মেনেই সব কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশনা রয়েছে।
৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত জুট মিলের মধ্যে আলিম জুট মিলের মালিকানা নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা থাকায় এটি ইজারা দেওয়া হয়নি। ২০২৩ সালের ১০ এপ্রিল যশোরের রাজঘাটের জেজেআই লিমিটেড মিলটি ইজারা নিয়েছে আকিজ জুট মিল লিমিটেড। বর্তমানে মিলটিতে পাটজাত পণ্য উৎপাদন চলছে। এতে ১ হাজার ৬৪২ শ্রমিক ও ১১০ কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত। একই এলাকার কার্পেটিং জুট মিলস ২০২৪ সালের ৩ জানুয়ারি ইজারা নেয় রিগ্যাল জুট। মিলটিতে পাটজাত পণ্যের উৎপাদন কাজ চলছে। ৩৭৮ শ্রমিক এবং ২৫ কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। আটরা এলাকার ইস্টার্ন জুট মিলস ২০২৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ইজারা নেয় আটলান্টিক জুট। এটিতেও উৎপাদন চলছে। মিলে ৬০৫ শ্রমিক ও ২৫ কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। খালিশপুর জুট মিলস ২০২৪ সালের ৪ জানুয়ারি ইজারা নেয় রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যাল। এর ৩টি ফ্যাক্টরির মধ্যে একটিতে পাটপণ্য উৎপাদন চলছে। অন্য দুটি ফ্যাক্টরির অবকাঠামোগত উন্নয়নে কাজ চলছে। দি ক্রিসেন্ট জুট মিলস কোম্পানি লিমিটেড ২০২৫ সালের ১৬ জুন ইজারা নেয় বিশ্বাস পোলট্রি অ্যান্ড ফিশ ফিডস। মিলটিতে একটি আটা ও ময়দা এবং আরেকটি ডাল তৈরির মেশিন স্থাপনের কাজ চলছে। মিলটিতে ৫০ শ্রমিক এবং ৬৪ কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। দৌলতপুর জুট মিলটি ২০২৩ সালের ২৪ আগস্ট ইজারা নেয় ইউনিওয়ার্ল্ড ফুটওয়ার টেকনোলজি। মিলটি চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে লে-অফ রয়েছে। এতে ১৩ কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত। এছাড়া সর্বশেষ প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলস ২০২৬ সালের ১৮ আগস্ট খুলনার হ্যামকো গ্রুপ লিজ নিয়েছে। দিঘলিয়ার স্টার জুট মিলস ২০২৬ সালের ১২ অক্টোবর ইজারা নেয় প্রাণ গ্রুপ। এ দুটিতে এখন সংস্কারকাজ চলছে। এদিকে খুলনা নিউজপ্রিন্ট এবং খুলনা হার্ডবোর্ড মিল ২৪ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। নিউজপ্রিন্ট মিলের প্রায় ৫০ একর জমির ওপর ২০১৮ সালে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ‘রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্লান্ট’ স্থাপন করা হলেও গ্যাসের সংকটের কারণে এটি এখনো চালু করা হয়নি। এ দুই মিলের পুরোনো যন্ত্রাংশ টেন্ডারে বিক্রি করা হয়েছে। যার প্রায় ৩০০ কোটি টাকা নিজস্ব ফান্ডে রয়েছে। যুগান্তরের অনুসন্ধানে একাধিক মিল পরিদর্শনে দেখা যায়, খালিশপুর জুট মিলে আগের চাকরিহারা শ্রমিকরা কাজ করছেন। তারা মিলটি নতুন করে চালু হওয়ায় আনন্দিত।
ক্রিসেন্ট জুট মিলের একটি শেডের দুই পাশে আটা, ময়দা এবং ডাল প্রক্রিয়াকরণের কাজ শেষ পর্যায়ে। দুই মাসের মধ্যে তারা উৎপাদনে যাবে বলে আশাবাদী প্রজেক্ট ম্যানেজার মো. শামীম। মিলটি চালু হলে শতাধিক শ্রমিকের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি এই এলাকার মানুষের জন্য কম দামে আটা, ময়দা, ডাল, তেলসহ নিত্যদ্রব্যাদি কারখানার দামে বিক্রির জন্য একটি শোরুম করা হবে।
প্লাটিনাম জুট মিল পরিদর্শনে গিয়ে সাক্ষাৎ হয় হ্যামকো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এটিএম মোস্তফার সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে জানান, মিলটি ইজারা নেওয়ার আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তার দীর্ঘসময় আলাপ হয়। খুলনার ব্যবসায়ীদের মধ্যে একমাত্র তার প্রতিষ্ঠানই রাষ্ট্রায়াত্ত মিলটি ইজারা নিয়েছে। দ্রুত কাজ চলছে। এখানে হ্যামকো গ্রুপের প্রধান কার্যালয় করা হতে পারে। পাশাপাশি ব্যাটারি উৎপাদন, ম্যাট্রেক্স, বালিশ, ফোমসহ ই-বাইক তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে চীনের একটি টিমের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়েছে। এখানে চাকরিতে খুলনার নারীরা অগ্রাধিকার পাবেন।
খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের এমডি আবু সাইদ যুগান্তরকে জানান, মিল দুটি চালু করার জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারিভাবে ওষুধ তৈরির কারখানা, পেপার মিল, ইভি ব্যাটারিসহ অন্যান্য ব্যাটারি উৎপাদনের মতো পরিকল্পনা রয়েছে। দুটি মিলে ব্যয়বহুল চারটি জেটি রয়েছে, যা অন্য কোথাও নেই। সরকারি উদ্যোগে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা হলে মিল দুটি পুনরায় চালু করা সম্ভব। এছাড়া বেসরকারিভাবে বিভিন্ন কোম্পানির কাছে ইজারা দিয়েও মিল চালু করা সম্ভব।
খুলনা-৩ আসনের সংসদ-সদস্য ও হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনের আগে আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম ফ্যাসিস্ট আমলে যেসব জুট মিল বন্ধ হয়েছে আমরা দায়িত্বপ্রাপ্ত হলে সেগুলো চালু করব। আমরা আমাদের কথা রেখেছি। এই অঞ্চলের যে জুট মিলগুলো বন্ধ ছিল সব চালু করতে সক্ষম হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ জুট মিলগুলো জুটের আদলে না হোক, অন্যভাবে ইজারাদাররা তাদের প্ল্যান্টগুলো স্থাপন করছে। ধীরে ধীরে হয়তোবা তারা বড় আকার ধারণ করবে। এর মাধ্যমে এ অঞ্চলের জনগণ কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে। নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে সব মিলই চালু অবস্থায় আছে। ইজারাদাররা চেষ্টা করছেন তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করার এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর। নিউজপ্রিন্ট মিলের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র হয়েছে। যেটি বন্ধ আছে, সেটি চালুর চিন্তাভাবনা আছে। এটি চালু হলে আরও ছোট ছোট কলকারখানা চালু হবে। আশা করি, খুলনার শিল্পাঞ্চল বলতে যে এলাকাগুলো বোঝায়, সেই শিল্পগুলো আবার আগের অবস্থায় ফিরবে।
