নিয়োগে অনিয়ম
২০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি নেসকো
Advertisement
রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডে (নেসকো) ২০ কর্মকর্তা ৬ বছর ধরে অবৈধভাবে চাকরি করে আসছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ২০ কর্মকর্তার নিয়োগ নিয়ে কয়েক বছর আগে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পাওয়া ২০ জনের নিয়োগে অনিয়ম ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু গত ৫ বছরেও প্রতিবেদনের আলোকে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে ২০ কর্মকর্তাকে বিধিবিধানের বাইরে নিয়োগের দায় কেউ নিচ্ছে না এখন। নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী জাকিউল ইসলামের গাফিলতিকে দায়ী করছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
২০১৬ সালের ১ অক্টোবর উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার ৩৯টি উপজেলায় বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি হিসাবে রাজশাহীতে প্রতিষ্ঠা হয় নেসকো। নেসকো বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) অধীন একটি রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি।
নেসকোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, ২০১৮ সালে নেসকোতে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে ২০ কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে মানা হয়নি চাকরিবিধি। চাকরিবিধি না মানায় অযোগ্যরা নেসকোর নির্বাহী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ লাভ করেন। এসব নিয়োগ নিয়ে মন্ত্রণালয় ও বিউবোতে অভিযোগ হলে বিউবোর তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী হযরত আলীকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ২০১৯ সালে কমিটি প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে ২০ কর্মকর্তা নিয়োগে বড় ধরনের অনিয়ম ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, নেসকো গঠনের সময় অনুমোদিত জনবল কাঠামোতে নির্বাহী প্রকৌশলীর ৬২টি পদ ছিল। ওই সময় নির্বাহী প্রকৌশলীর ৫৫টি পদই শূন্য ছিল। ২০১৮ সালের ৫ জুলাই ৫৫টি নির্বাহী প্রকৌশলীর পদ পূরণে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। নির্বাহী প্রকৌশলী পদের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগে সাত বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। ওই বছরের ২১ জুলাই নেসকোর বোর্ড সভায় তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ গোলাম আহম্মেদকে প্রধান করে ১০ সদস্যের নিয়োগ কমিটি গঠন করা হয়। নিয়োগ কমিটির অধিকাংশ সদস্যই ছিলেন নেসকোর কর্মকর্তা। ২০১৮ সালের ২৩ অক্টোবর বুয়েটে অনুষ্ঠিত লিখিত পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে ৬৪ জনকে মৌখিক পরীক্ষায় ডাকা হয়।
নিয়োগ শেষ হওয়ার পর বঞ্চিত প্রার্থীরা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় এবং বিউবোতে অভিযোগ করেন যে নিয়োগ কমিটি কারসাজি করে নিয়োগ শর্ত পূরণ না করা প্রার্থীদের নিয়োগ দিয়েছেন। এমনকি চূড়ান্ত নিয়োগ পাওয়া কেউ কেউ অভিজ্ঞতার ভুয়া সনদ দিয়েও নিয়োগ লাভ করেন। প্রথম পর্যায়ে ২০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে নিয়োগ পান আরও পাঁচজন।
এ সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক সহকারী প্রকৌশলী যারা উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পাননি বা পাওয়ার যোগ্য নন, তাদের আবেদন বৈধ হয় এবং তারা লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, একজন সহকারী প্রকৌশলী উপবিভাগীয় প্রকৌশলী না হয়ে কোনোভাবেই সরাসরি নির্বাহী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পেতে পারেন না।
কারণ, সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী নির্বাহী প্রকৌশলীর পদটি পঞ্চম গ্রেডের। কিন্তু একজন সহকারী প্রকৌশলী সপ্তম গ্রেডের বা নিচের গ্রেডের।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাহী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ইয়াসির আরাফাতের সর্বসাকুল্যে অভিজ্ঞতা ৭ বছরের চেয়ে ১৪ দন কম ছিল আবেদনের শেষদিন। নির্বাহী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পাওয়া মোস্তাফিজুর রহমান, সাইফুল্লাহ রায়হান, কামাল আহমেদ, মোছানেক কবির, হাবিবুর রহমান, ফজলুর রহমান, মাহমুদুল হাসান, মাহমুদুর রহমান, আসাদুর রহমান খান, মোহাম্মদ নাফিদ হাসান গালিব, আব্দুল মতিন এবং মনির হোসেনের চাকরিতে ৭ বছরের অভিজ্ঞতা ছিল না আবেদনের সময়। এছাড়া নিয়োগ শর্তানুযায়ী নির্বাহী প্রকৌশলী পদে আবেদনের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ছিল ৪০ বছর। কিন্তু ৪০ বছরের বেশি বয়সের প্রার্থী গোলাম মোস্তফা নিয়োগ লাভ করেন। কোনো কোনো প্রার্থীর সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে চাকরির অভিজ্ঞতা সাত বছর ছিল না। এভাবে নয়ছয় করে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ সম্পন্ন করে কমিটি।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অভিযোগ তদন্তকালে নিয়োগ কমিটির অনেক সদস্যই নিজেদের দায়দায়িত্ব অস্বীকার করেন। নিয়োগ কমিটির সদস্য নেসকোর সহকারী মহাব্যবস্থাপক আবু মোত্তালেব বলেন, আমি সদস্য ছিলাম তবে নিয়োগের কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলাম না। অন্য সদস্যরা অধিকাংশই তদন্ত কমিটির সামনে নিজেদের দায়দায়িত্ব এড়িয়ে যান। তারা নিয়োগ সংক্রান্ত সব দায়দায়িত্ব নেসকোর এমডি প্রকৌশলী জাকিউল ইসলামের ওপর চাপান। তদন্ত প্রতিবেদনে অসাধু পন্থায় নিয়োগ পাওয়া ২০ নির্বাহী প্রকৌশলীর নিয়োগ বাতিলসহ তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। তবে ৫ বছরেও তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করেনি নেসকোর পরিচালনা বোর্ড। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এখন এসব বিতর্কিত নিয়োগ বাতিল চেয়েছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) জাকিউল ইসলাম বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ধামাচাপা দেওয়া হয়নি। প্রতিবেদনটি আমি সম্প্রতি হাতে পেয়েছি। নেসকোর আগামী বোর্ড সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করে নিয়োগ পাওয়াদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কেউ যদি ভুল তথ্য দিয়ে নিয়োগ পেয়ে থাকেন, চাকরিবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
