সংকুচিত আয়ের খাত
প্রশাসনিক ও রাজস্ব খাতের সংস্কার জরুরি
Advertisement
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সংকুচিত রাজস্ব আদায়, বিনিয়োগে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা এবং অনিয়ন্ত্রিত ব্যয়ের কারণে দেশের অর্থনীতি আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। শনিবার যুগান্তরের খবরে প্রকাশ-রাজস্ব ঘাটতি সামাল দিতে সরকারকে অনবরত অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অর্থ সংকটের কারণে ঋণ গ্রহণ কোনো টেকসই সমাধান যে হতে পারে না, তা বলাই বাহুল্য; বরং পরিশোধের অক্ষমতা ও উৎপাদনশীল খাতের অনুপস্থিতি জাতীয় অর্থনীতিকে এক ঋণফাঁদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যদিও এ অস্থিতিশীলতা একদিনে তৈরি হয়নি; বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বছরের পর বছর ঋণ নিয়ে তা যথাযথ উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার না করে লুটপাট, অপচয় এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বৃদ্ধির ফলস্বরূপ পুঞ্জীভূত হয়েছে। ফলে একদিকে সরকারের সংগৃহীত আয়ের খাত ক্রমেই ক্ষয়িষ্ণু হচ্ছে, অন্যদিকে ঋণের কিস্তি ও সুদের দায় মেটাতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় তহবিল খালি হয়ে পড়ছে।
এই সঙ্গিন অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত ও গঠনমূলক নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক ফাঁকফোকর বন্ধ করে আয়ের পরিধি বাড়ানোই হতে হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আমরা মনে করি, রাজস্ব আদায়ে অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ না করে কর কাঠামোর আধুনিকায়ন এবং বকেয়া রাজস্ব উদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া, অনুৎপাদনশীল খাত বা অনাবশ্যক অবকাঠামোগত প্রকল্পে ঢালাও ঋণ নেওয়ার প্রবণতা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। ঋণ থেকে সংগৃহীত অর্থ যেন কর্মসংস্থান, নতুন শিল্প স্থাপন এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধির মতো প্রত্যক্ষ উৎপাদনমুখী খাতে ব্যবহার হয়, তা নিশ্চিত করাও জরুরি। অহেতুক নতুন প্রকল্প গ্রহণ কিংবা অনাবশ্যক ব্যয় বাড়ানোর বদলে চলমান প্রকল্পগুলোর গুণগত মূল্যায়নও এখন সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পদের কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে কিছু সাহসী অর্থনৈতিক পদক্ষেপ বিবেচনা করা দরকার। অলাভজনক বা পরিচালনা ব্যয়বহুল অবকাঠামো কিংবা প্রকল্পের পরিচালন দায়িত্ব বা শেয়ার ইজারা দেওয়ার মাধ্যমে সরকারের হাতে তাৎক্ষণিক তারল্য আনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তদুপরি, সরকারি খাতের দুর্নীতি ও আর্থিক অপচয় কঠোর হাতে দমন করা ছাড়া অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার প্রত্যাবর্তন অসম্ভব। ঋণের সুদের ভার মেটাতে গিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা কিংবা উন্নয়ন বাজেটের মৌলিক খাতগুলো যেন সংকুচিত না হয়, সেদিকেও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। বৈদেশিক মুদ্রা ও রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে প্রবাসী আয় এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে।
আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থার শর্ত মেনে নিছক তড়িঘড়ি কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি সুশাসনের ওপর নজর দেওয়া বেশি জরুরি। শ্রীলংকা বা ঘানার অর্থনৈতিক সংকটের অভিজ্ঞতা আমাদের স্পষ্ট শিক্ষা দেয়-সময়মতো আর্থিক সংস্কার, ঋণের পুনর্গঠন এবং রাজস্ব বাড়ানোর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি যে কোনো সময় মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। বর্তমান বাস্তবতায় একটি গতিশীল ও টেকসই অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন প্রশাসনিক সততা, ঋণের যৌক্তিক ব্যবহার এবং বাস্তবমুখী পরিকল্পনা। সরকার অবিলম্বে সুদৃঢ় সংস্কারমূলক পদক্ষেপের দিকে অগ্রসর হয়ে অর্থনীতিকে সামাল দেওয়ার সঠিক ও টেকসই পথ উন্মোচন করবে-এটাই প্রত্যাশা।
