মাদকের ভয়াবহ বিস্তার
গডফাদারদের আইনের আওতায় আনা জরুরি
Advertisement
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মাদক এক নীরব মরণব্যাধি, যা তিলে তিলে ধ্বংস করে দিচ্ছে আমাদের তরুণ সমাজকে। গতকাল যুগান্তরে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে দেশের মাদক সাম্রাজ্যের এক ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু খুচরা মাদক বিক্রেতা জেলহাজতে ধুঁকলেও নেপথ্যের গডফাদার বা ‘মহারাজারা’ বহাল তবিয়তে সুদৃশ্য ড্রয়িংরুমে বসে বিশাল মাদক সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন, যা আমাদের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কার্যকারিতার ওপর এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে অন্তত ১ হাজার ৬২০ জন গডফাদার এবং ২১ হাজার মাদক কারবারি এই অদৃশ্য সাম্রাজ্যের সঙ্গে জড়িত। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট অঞ্চলে সুনির্দিষ্ট তালিকাভুক্ত এসব গডফাদার মাদকের বিভিন্ন স্পট নিয়ন্ত্রণ করছেন। উদ্বেগের বিষয় হলো, মাঠপর্যায়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ এবং খুচরা বিক্রেতা গ্রেফতার হলেও গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছেন। তারা সরাসরি মাদক বহন বা সংরক্ষণ করেন না এবং তাদের নামে সুনির্দিষ্ট মামলা না থাকায় আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের ধরা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, মাদক ব্যবসা শুধু খোলস পালটালেও এর শিকড় দিনদিন আরও গভীরে ছড়িয়ে পড়ছে।
মাদকের এই ভয়াবহ বিস্তার সমাজকে কতটা পঙ্গু করে দিচ্ছে, তার প্রমাণ মিলছে বিভিন্ন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও বিরোধের জেরে কুষ্টিয়া, রাজশাহী, গাজীপুর ও কুমিল্লায় একের পর এক প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। কুমিল্লার স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড এবং রংপুরে এক পরিবারের চারজনকে হত্যার নেপথ্যেও মাদক সিন্ডিকেটের সম্পৃক্ততা বেরিয়ে এসেছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, মাদক ব্যবসায়ীরা এখন সমাজের সাধারণ মানুষের জীবনকে জিম্মি করে ফেলেছে এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেই নেমে আসছে নৃশংস হামলা।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও উদ্বেগজনক করে তুলেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু অসাধু সদস্যের মাদক বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা। আদালতের মাদক ধ্বংসের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্য কিংবা প্রিজনভ্যান থেকে শীর্ষ মাদক কারবারিকে পালানোর ব্যাপারে সহযোগিতা করার মতো ঘটনাগুলো পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের জন্যই উদ্বেগজনক। পুলিশ সদর দপ্তর মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বললেও কিছু দুর্নীতিপরায়ণ সদস্যের কারণে সেই নীতির বাস্তবায়ন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
মাদক সমস্যা কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বা বিচ্ছিন্ন অভিযানের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বহুমুখী ও জোরালো সামাজিক আন্দোলন। প্রথমত, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী করে নেপথ্যের গডফাদারদের গ্রেফতার করতে হবে এবং তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে-তারা যত প্রভাবশালীই হোন না কেন। দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা দুর্নীতিবাজ ও অপরাধের সহযোগীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, মাদকের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। মাদক নির্মূলের এই লড়াইয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সামাজিক সচেতনতার পাশাপাশি আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারলে আমরা মাদকমুক্ত একটি সুস্থ ও নিরাপদ সমাজ ফিরে পেতে পারি।
