প্রবীণদের শেষ জীবনের নিরাপত্তা
আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা
Advertisement
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পাবনার সাঁথিয়ায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে ঘটা একটি ঘটনা আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের এক নির্মম চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। স্বামীহারা অসুস্থ এক মা মুন্নি খাতুন শেষ বয়সে একটু আশ্রয়ের জন্য ছেলে সাগর হোসেনের মুখে-মাথায় হাত বুলিয়ে আকুতি জানিয়েছেন, ‘আমাকে ছেড়ে দিস না বাবা। আমার টাকাপয়সা লাগবে না। ভালো খাবার লাগবে না। আমি তোর সঙ্গেই বাকি কয়টা দিন থাকতে চাই।’ কিন্তু সেই যুবকের বুক এতই পাথরের মতো শক্ত ছিল যে, তিনি কোনোভাবেই মাকে সঙ্গে রাখতে রাজি হননি। এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়।
আমাদের দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে মা-বাবার শেষ বয়সের একমাত্র অবলম্বন সন্তান। প্রতিটি মা-বাবা নিজেদের সব সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে তিল তিল করে সন্তানকে লালন-পালন করেন। নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দেওয়া, ভবিষ্যতের স্বপ্ন গড়া, সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে সন্তান। তাই বার্ধক্যে এসে তাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা থাকে সন্তানের স্নেহ, সম্মান এবং নিরাপদ আশ্রয়।
কিন্তু আজ এই চিরায়ত বন্ধনে ফাটল ধরেছে। সন্তান যখন বড় হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ায়, তখন বহু মা-বাবার কপালে জোটে অবহেলা, কখনো বা বৃদ্ধাশ্রম কিংবা কঠিন নিঃসঙ্গতা। অর্থনৈতিক দায়িত্ব পালনকে অনেকেই পিতামাতার প্রতি কর্তব্যের শেষ সীমা মনে করছেন। প্রশ্ন হলো, শেষ বয়সে সন্তানের একটু আশ্রয় না পেলে এই বৃদ্ধ মানুষগুলো কোথায় যাবেন? আইন বা প্রশাসন দিয়ে হয়তো জোর করে ভরণপোষণ নিশ্চিত করা সম্ভব, কিন্তু সন্তানের বুকভরা ভালোবাসা কি জোর করে আদায় করা যায়?
পাবনার এ ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন পরিবার বা একক কোনো মায়ের কষ্ট নয়; এটি আমাদের সমাজের সামগ্রিক নৈতিক সংকটের প্রতীক। আধুনিকতার দৌড়ে ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতার ধাক্কায় আজ পারিবারিক বন্ধনগুলো আলগা হয়ে পড়ছে। মা-বাবার ত্যাগের প্রতি সম্মান জানানোর শিক্ষা আমাদের পরিবার ও সমাজ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে।
মুন্নি খাতুনের আকুতিটি শুধু নিজের সন্তান নয়, বরং পুরো জাতির শুভবুদ্ধির প্রতি একটি গভীর আবেদন। তাই আমাদের সমাজে এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কোনো মা আর বুকভরা কান্না নিয়ে বলতে বাধ্য হবেন না, ‘টাকা চাই না, তোর সঙ্গে রাখ বাবা।’
