বিমানবন্দরের আধুনিকায়ন
সর্বাগ্রে প্রয়োজন কৌশলগত সতর্কতা
Advertisement
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল চালুর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা আগামী ১৬ ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হলেও এর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অচলাবস্থা উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। শুক্রবার যুগান্তরের খবরে প্রকাশ-আন্তর্জাতিকমানের এই আধুনিক টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তি নিষ্পত্তিতে জাপানি কনসোর্টিয়ামের আরোপিত চারটি কঠিন শর্ত আলোচনার সার্বিক গতিতে বাধা সৃষ্টি করছে। শুরু থেকেই বিকল্প কোনো বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে সমান্তরাল আলোচনা না থাকায় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ দরকষাকষির টেবিলে একরকম দুর্বল অবস্থানে পড়েছে, যা চুক্তি বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় স্বার্থরক্ষায় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বলা বাহুল্য, প্রকল্পটির অবকাঠামোগত নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছানো এবং ইতোমধ্যে ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়ে যাওয়ার পরও পরিচালনগত কাঠামোর অনিশ্চয়তা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
উল্লেখ্য, মেগা প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও পরিচালনগত সফলতা মূলত প্রাথমিক পর্যায়ে গৃহীত সুবিবেচনাপ্রসূত ও ভারসাম্যপূর্ণ শর্তাবলির ওপর নির্ভর করে। বিশেষ করে রাজস্ব ভাগাভাগির হার কমানো, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের বাণিজ্যিক ঝুঁকি বণ্টন, বিশেষ আইনি দায়মুক্তি সুবিধা দাবি এবং ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড বা প্রকল্পের ত্রুটি সংশোধনের সময়সীমা সংক্রান্ত অমীমাংসিত বিষয়গুলো জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কার্যক্রমের প্রথম আট মাসে দেশের রাজস্ব অর্ধেকের বেশি কমিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব কিংবা দেশের প্রচলিত আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্তির দাবি বাংলাদেশের সার্বভৌম আইনি অবস্থানের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। এমন পরিস্থিতিতে তাড়াহুড়ো করে চুক্তি সই করতে গিয়ে রাজস্ব কিংবা বৈশ্বিক প্রশাসনিক অবস্থানকে ঝুঁকিতে ফেললে এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি বহন করতে হবে দেশের এভিয়েশন খাত তথা জনগণকেই।
আমরা মনে করি, বিজয় দিবসে উদ্বোধনের তারিখ রক্ষার চেয়ে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও আইনি নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করাই সরকারের মূল অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। আন্তর্জাতিক যে কোনো বিনিয়োগকারী বা কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা রক্ষা করা প্রয়োজন। তাই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সক্ষমতার বাণিজ্যিক সুরক্ষা, দায়দায়িত্ব এবং প্রাপ্য রাজস্বের বিষয়ে বিন্দুমাত্র অস্পষ্টতা রাখা সমীচীন নয়। উদ্বোধনের প্রথম দিনে কয়টি ফ্লাইট ওঠানামা করবে-তার চেয়েও বড় বিষয় হলো, টার্মিনালটি চালুর পর তা কতটা নিরবচ্ছিন্ন, নিরাপদ এবং বিশ্বমানের সেবা দিতে সক্ষম হবে। প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক বাজারের স্বার্থে কেবল একটি পক্ষের ওপর অতি-নির্ভরশীল থাকার এ কৌশলগত ঘাটতিকে শিক্ষা হিসাবে গ্রহণ করে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা সাজাতে হবে।
যেহেতু বিষয়টি আইন ও অর্থ মন্ত্রণালয়সহ উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত, তাই চুক্তির প্রতিটি ধারা ও অনুচ্ছেদ নিবিড় আর্থিক ও কৌশলগত মূল্যায়নের মাধ্যমে পুনর্নিরীক্ষণ করা অপরিহার্য। বাণিজ্যিক চুক্তিতে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের অগ্রাধিকারকে কোনো অবস্থাতেই ক্ষুণ্ন হতে দেওয়া যাবে না। ভুলে গেলে চলবে না, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আমাদের জাতীয় মর্যাদা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও বিশ্বপরিমণ্ডলে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দূরদর্শী কূটনীতি ও কঠোর পর্যালোচনার মাধ্যমে একটি লাভজনক, সুষম ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ চুক্তি সম্পাদন করে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার পাশাপাশি দ্রুততম সময়ে থার্ড টার্মিনাল সচল করতে সক্ষম হবে-এটাই প্রত্যাশা।
