এলডিসি উত্তরণের প্রভাব
ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজন আগাম পদক্ষেপ
Advertisement
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণ আমাদের জন্য অর্থনৈতিক উন্নতির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হলেও তা ভবিষ্যতে স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষেত্রে একটি অগ্নিপরীক্ষাও বটে। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণের বরাত দিয়ে শনিবার যুগান্তরের খবরে প্রকাশ-এলডিসি উত্তরণের পর শুল্ক ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা হারানোর ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে বিপুল পরিমাণ শুল্ক বাধা তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে শত শত কোটি ডলারের বাণিজ্যে। তৈরি পোশাকের মতো প্রধান খাত তো বটেই, ওষুধশিল্পের মেধাস্বত্ব বা আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রেও আসবে বড় ধরনের গুণগত পরিবর্তন। ফলে এটা স্পষ্ট যে, উত্তরণ-পরবর্তী বিশ্ববাজারে তীব্র প্রতিযোগী মনোভাব নিয়ে টিকে থাকতে হলে আমাদের বাণিজ্য কাঠামো ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নীতিমালায় অবিলম্বে যুগোপযোগী সংস্কার আনা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।
বাস্তবতা হলো, শুল্ক সুবিধা বন্ধ হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের পণ্যের মূল্য বাড়বে এবং প্রতিযোগিতার দৌড়ে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেবে। বিশেষ করে ইউরোপ, কানাডা বা জাপানের মতো প্রধান বাজারগুলোতে শুল্কের নতুন হার আরোপিত হলে তা কেবল রপ্তানি আয়েই প্রভাব ফেলবে না, দেশের সার্বিক কর্মসংস্থান ও রাজস্ব ব্যবস্থায়ও বড় ধাক্কা দেবে। তবে আমরা মনে করি, এ চিত্রে কেবল আশঙ্কিত না হয়ে বরং আগাম সতর্ক হয়ে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়াই উত্তম। জাতিসংঘ থেকে বাড়তি সময় পাওয়া বা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক চুক্তি বাস্তবায়নের সুযোগগুলোকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারলে আখেরে তা কল্যাণই বয়ে আনবে।
আমাদের অর্থনীতির অন্যতম বড় দুর্বলতা হচ্ছে একক পণ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দরকষাকষির সামর্থ্য বাড়াতে চামড়া, কৃষি ও মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সিরামিক ও হস্তশিল্পের মতো খাতগুলোতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনা প্রদান আবশ্যক। একইসঙ্গে দেশের ওষুধ খাতকে ট্রিপস বা মেধাস্বত্ব সম্পর্কিত সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক চাপ সামলাতে এখন থেকেই কাঁচামাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং গবেষণায় বড় বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হবে। বিদেশের মাটিতে দেশের অর্থনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধিতে কূটনৈতিক মিশনের তৎপরতা আরও শক্তিশালী করা এবং বৈচিত্র্যময় নতুন নতুন বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাও এখন সময়ের দাবি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এলডিসি উত্তরণের পর আমরা আর কেবল শুল্কছাড় বা সরকারি আর্থিক প্রণোদনার ওপর নির্ভর করে বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে পারব না। আন্তর্জাতিক স্তরে প্রতিযোগিতায় জিততে আমাদের প্রয়োজন উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও কারখানার আধুনিকায়ন। শ্রমিকদের কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি, ব্যবসার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং বিদ্যুৎ ও বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে জাতীয় পর্যায়ের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও তার দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি। কেবল সময় চাওয়া কিংবা সাময়িক সুবিধার মেয়াদ বৃদ্ধি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের প্রস্তুত করাই বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। দেশের অর্থনৈতিক এ সন্ধিক্ষণে সরকার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষ সঠিক সময়ে সুচিন্তিত ও সাহসী পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে সক্ষম হবে, এটাই প্রত্যাশা।
