স্বীকৃতিহীন সাধনা
সেন্টু হাজং ও আমাদের কৃষিসম্পদ
Advertisement
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রাতিষ্ঠানিক কোনো গবেষণাগার নেই, নেই উন্নত যন্ত্রপাতি কিংবা উচ্চতর কোনো ডিগ্রি। তবু নিজের অদম্য কৌতূহল, মেধা ও একান্ত প্রচেষ্টায় ২১ বছর ধরে ধানের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করে চলেছেন শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার কৃষক সেন্টু চন্দ্র হাজং। মাত্র ১২ কাঠা জমির ছোট পরিসরে ৪৪০টি পরীক্ষামূলক প্লট তৈরি করে ইতোমধ্যে ২৫টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, হারিয়ে যেতে বসা দেশি ধান সংরক্ষণেও তিনি রেখে চলেছেন অনন্য ভূমিকা। তার এই নিরলস সাধনা কেবল একজন ব্যক্তির সাফল্য নয়, বরং এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদের লোকায়ত জ্ঞান ও উদ্ভাবনী শক্তির এক উজ্জ্বল নিদর্শন।
সংকরায়ণ বা হাইব্রিডাইজেশনের মতো জটিল প্রক্রিয়া নিজের আয়ত্তে এনে সেন্টু হাজং একে একে সেন্টু শাইল, সেন্টু পাইজাম, চিনি শাইল ও তুলশিমালার মতো জাতগুলো উদ্ভাবন করেছেন। স্থানীয় কৃষকরা তার উদ্ভাবিত ধানের ভালো ফলন ও সুস্বাদু চালের সুফল পাচ্ছেন। পাশাপাশি রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈবসার ব্যবহার করে তিনি পরিবেশবান্ধব কৃষিরও এক উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে গেলেও তার উদ্ভাবিত জাতগুলো এখনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি। প্রত্যয়ন বা সার্টিফিকেটের অভাবে তিনি এই বীজ বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করতে পারছেন না, যা একজন নিবেদিতপ্রাণ উদ্ভাবকের জন্য চরম হতাশার।
আমাদের কৃষি খাত আজ নানা দিক থেকে এগিয়ে গেলেও জলবায়ু পরিবর্তন ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় বহু দেশি ধানের জাত আজ বিলুপ্তির পথে। এই সংকটময় সময়ে সেন্টু হাজংয়ের মতো প্রান্তিক গবেষকরা নিজ উদ্যোগে যে দেশি ধানের ভান্ডার টিকিয়ে রেখেছেন, তা জাতীয় সম্পদে পরিণত হতে পারত-যদি যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা থাকত।
আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং কৃষি মন্ত্রণালয় দ্রুত সেন্টু চন্দ্র হাজংয়ের উদ্ভাবিত ধানের জাতগুলোর বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন ও প্রত্যয়নের ব্যবস্থা করবে। একইসঙ্গে তার জন্য একটি ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও গবেষণার সুযোগ ও সহায়তা নিশ্চিত করা হোক। প্রান্তিক এই কৃষকের মেধার যথাযথ মূল্যায়ন কেবল তার একারই প্রাপ্তি নয়, এটি আমাদের জাতীয় কৃষির উদ্ভাবনী সংস্কৃতিকেই সম্মানিত করবে।
