গ্রামে শিক্ষকের জন্য হাহাকার
বৈষম্য নিরসনে চাই প্রশাসনিক সংস্কার
Advertisement
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শিক্ষা প্রত্যেক মানুষের মৌলিক অধিকার, আর শিক্ষক হলেন সমাজ গড়ার কারিগর। বলা বাহুল্য, শিক্ষা খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা যে কোনো দেশের জন্যই টেকসই অগ্রগতির প্রধান শর্ত। কিন্তু আমাদের দেশে সরকারি কলেজগুলোর শিক্ষক পদায়নে যে চরম বিশৃঙ্খলা ও বৈষম্যের চিত্র ফুটে উঠেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বৃহস্পতিবার যুগান্তরের খবরে প্রকাশ-রাজধানীর ২৫টি সরকারি কলেজে অনুমোদিত পদের চেয়ে প্রায় ৭০০ শিক্ষক বেশি রয়েছেন; যাদের অনেকেই নিয়মিত ক্লাস নেন না। কারও কারও সময় কাটে ঘোরাফেরা আর আড্ডায়। অথচ ঢাকার বাইরের জেলা ও প্রত্যন্ত এলাকার কলেজগুলোয় শিক্ষক সংকটে ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত পাঠদান। মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রান্তিক শিক্ষার্থীরা।
যে শিক্ষকরা সমাজের বিবেক হয়ে আলোর পথ দেখাবেন, তাদের একাংশের মধ্যে রাজধানীমুখী সুবিধাবাদী প্রবণতা এ অবস্থার জন্য মূলত দায়ী। এর ফলে আমাদের প্রান্তিক শিক্ষা কাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিতাপের বিষয়, রাজনৈতিক তদবির কিংবা বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের সুপারিশের অপব্যবহার করে ঢাকায় পদায়ন পাওয়ার যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা বিগত দিনগুলোতে তৈরি হয়েছে, তাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী তরুণদের মেধা ও সম্ভাবনা বিনষ্ট হচ্ছে। গ্রাম ও শহরের পাঠদানের এ বিশাল ব্যবধান আমাদের মানবিক মূল্যবোধ ও প্রশাসনিক সুশাসনের পরিপন্থি।
আমরা মনে করি, এই কাঠামোগত বৈষম্য ও ভুলগুলো শক্ত হাতে শুধরে নেওয়ার এখনই সময়। কারণ কোনো প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার অধিকার কারও থাকতে পারে না। শিক্ষা খাতে যে মানবিক ও প্রশাসনিক বিপর্যয় ঘটেছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে (মাউশি) অত্যন্ত কঠোর ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
ঢাকার কলেজগুলোতে অতিরিক্ত হিসাবে অলস সময় কাটানো শিক্ষকদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে তাদের যেসব মফস্বল কলেজে শিক্ষক সংকট রয়েছে, সেখানে জরুরি ভিত্তিতে বদলি করা উচিত। পাশাপাশি পদোন্নতি ও চাকরি টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে মফস্বল বা প্রান্তিক এলাকায় নির্দিষ্ট মেয়াদে শিক্ষকতা বাধ্যতামূলক করাও জরুরি, যেন সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়। শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি ও পাঠদান নিশ্চিত করার জন্য আধুনিক ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে মাস শেষে বিনা ক্লাসে তাদের বেতন তোলার সুযোগ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
শিক্ষা কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের জায়গা কিংবা ক্ষমতা প্রদর্শনীর ক্ষেত্র নয়, এটি জাতির মেরুদণ্ড গড়ার মাধ্যম। রাজধানীর অতিরিক্ত শিক্ষকদের গ্রামের মেঠোপথের স্কুল-কলেজে পুনর্বিন্যাস করে যদি প্রকৃত শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা যায়, তবেই ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠন সম্ভব হবে।
মাউশির মহাপরিচালক ও শিক্ষা সচিবের বক্তব্যে যে সংস্কারের প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছে, তার সঠিক ও দ্রুত বাস্তবায়ন দেখতে চাই আমরা। কোনো প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত শিক্ষক এবং অন্য প্রতিষ্ঠানে সংকট-এ বৈষম্য চিরতরে দূর করতে হবে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ এবং প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত চাহিদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষক পদায়ন নীতি প্রণয়ন করতে পারলে রাজধানী ও গ্রামের শিক্ষার্থীরা প্রকৃত জ্ঞানের আলোর পরশ পাবে এবং এক্ষেত্রে বৈষম্যের অবসান হবে।
