এলডিসি উত্তরণে বাড়তি সময় প্রাপ্তি
সাময়িক স্বস্তিকে টেকসই সক্ষমতায় রূপান্তর জরুরি
Advertisement
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর নির্ধারণ করতে জাতিসংঘের ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। করোনা মহামারি এবং বৈশ্বিক নানা সংকটে দেশের অর্থনীতি যে চাপের মুখে পড়েছিল, এই তিন বছরের বিলম্ব নিঃসন্দেহে অর্থনীতিতে একটি সাময়িক স্বস্তি নিয়ে এসেছে। কিন্তু উত্তরণ পিছিয়ে যাওয়ার অর্থ কোনোভাবেই আত্মতুষ্টিতে ভোগার সুযোগ নয়। বরং এটি হলো সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করার এক অতিমূল্যবান উইন্ডো অব অপারচুনিটি। উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশ যেসব শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা ভোগ করে আসছে, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ বা যুক্তরাজ্যের বাজারে বিদ্যমান সুবিধাগুলো একটি নির্দিষ্ট সময় পর আর থাকবে না। তখন বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে হবে সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দিয়ে।
এই কঠিন বাস্তবতাকে সামনে রেখে সরকার ২০২৬-২৯ মেয়াদের জন্য যে পাঁচ স্তম্ভের জাতীয় রোডম্যাপ চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে মনে করি আমরা। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বাণিজ্য রূপান্তর, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং সুশাসন-এই পাঁচটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ অর্থনীতির টেকসই রূপরেখা প্রণয়ন করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। আমাদের রপ্তানি খাত দীর্ঘকাল ধরেই তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর নির্ভরশীল। এই একক নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে রোডম্যাপে ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, হালকা প্রকৌশল, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও চামড়াসহ যে ১৩টি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তার সফল বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ২০২৬ সালের মধ্যে তৈরি পোশাকবহির্ভূত পণ্যের রপ্তানি ২৫ শতাংশে উন্নীত করার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জন করতে হলে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে। পাশাপাশি, ৩৮টি দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি ও সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সম্পাদনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা আরও বেগবান করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আলোচনায় কার্যকর দরকষাকষির জন্য দক্ষ নেগোসিয়েটর দল গঠন অত্যন্ত জরুরি।
তবে শুধু বাহ্যিক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমেই সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব নয়, যদি না অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর করা যায়। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের চলমান বিশৃঙ্খলা, জ্বালানি খাতের অস্থিরতা এবং বিনিয়োগ পরিবেশের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা-এই ত্রিমাত্রিক বাধা দূর করতে কাঠামোগত সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু এবং কাস্টমস ব্যবস্থার আধুনিকায়নের মাধ্যমে দেশে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমিয়ে আনতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, জনখাতে স্বচ্ছতা ও কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে কোনো রোডম্যাপই আলোর মুখ দেখবে না।
বলা বাহুল্য, এলডিসি উত্তরণের এই বাড়তি তিন বছরকে কোনোভাবেই বাড়তি ছুটির সময় হিসাবে দেখার অবকাশ নেই। একে দেখতে হবে প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করার একটি কঠোর সময়সীমা হিসাবে। সরকার, বেসরকারি খাত, উদ্যোক্তা এবং নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত ও নিরলস প্রচেষ্টাই পারে ২০২৯ সালের পরবর্তী বিশ্ববাজারে বাংলাদেশকে একটি আত্মনির্ভরশীল ও প্রতিযোগিতামূলক শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে।
