এইচএসসির ফল বিপর্যয়ের বার্তা
শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন
Advertisement
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল দেশের শিক্ষাব্যবস্থার গভীর সংকটের একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করছে। ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া এবং পাশের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে নেমে আসা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। গত ৩৬ বছরের মধ্যে এক বছরে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। তবে এ ফলাফলকে কেবল শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা হিসাবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এর মধ্য দিয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতার বিষয়টি সামনে এসেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কেন পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল অর্জন করতে পারল না? এর উত্তর খুঁজতে হলে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে পর্যালোচনা করতে হবে। শিক্ষাবিদদের মতে, অনেক শিক্ষার্থী প্রাথমিক স্তরেই প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। সেই শিখনঘাটতি নিয়েই তারা পরবর্তী শ্রেণিতে উঠছে। একপর্যায়ে সেই ঘাটতি এতটাই প্রকট হয়ে ওঠে যে পরীক্ষার ফলাফলে তার প্রতিফলন ঘটে। শিক্ষার মান নেমে যাওয়ার পেছনে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান হয় না, কোথাও বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের অভাব রয়েছে। শিক্ষকদের একাংশের পাঠদানে অনাগ্রহ, জবাবদিহির ঘাটতি এবং কোচিংনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা শ্রেণিকক্ষের শিক্ষাকে দুর্বল করে তুলছে। আবার দুর্বল শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে বাড়তি পাঠদান ও সহায়তার কার্যকর ব্যবস্থাও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে নেই। এসব সমস্যার সমাধান না করে শুধু পরীক্ষার ফল ভালো করার প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
তবে পরীক্ষায় বেশি শিক্ষার্থী পাশ করা মানেই যে শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাওয়া, এমন ধারণাও ঠিক নয়। বরং শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে কতটা শিখছে, তাদের জ্ঞান ও দক্ষতা কতটা বাড়ছে, সেটিই হওয়া উচিত শিক্ষার মান নির্ধারণের প্রধান মাপকাঠি। প্রকৃত মূল্যায়নের মাধ্যমে দুর্বলতা চিহ্নিত হলে তা সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে।
বস্তুত এ সংকট উত্তরণে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা। শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের নিশ্চয়তা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে কঠোর তদারকি থাকতে হবে। একইসঙ্গে প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি নির্ণয় করে বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, শিক্ষা কেবল পরীক্ষায় পাশের সনদ অর্জনের বিষয় নয়; এর উদ্দেশ্য জ্ঞান, দক্ষতা ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক গড়ে তোলা। এবারের ফলাফলকে তাই ব্যর্থতা হিসাবে না দেখে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে হবে সংশ্লিষ্টদের।
