পোশাকশিল্পে অনাকাঙ্ক্ষিত অস্থিরতা
দেশের অর্থনীতি বাঁচাতে চাই কার্যকর পদক্ষেপ
Advertisement
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে যে তীব্র আন্দোলন ও অস্থিরতা শুরু হয়েছে, তা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এলাকাগুলোতে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে শ্রমিকরা রাজপথে নেমেছেন। তাদের এই দাবির পেছনে রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির নিষ্ঠুর বাস্তবতা। সাধারণ একজন শ্রমিকের পক্ষে বর্তমান মজুরিতে সংসার চালানো, বাসাভাড়া ও চিকিৎসা ব্যয় মেটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে শ্রমিকদের ক্ষোভ ও হতাশা স্বাভাবিক এবং তাদের ন্যায়সংগত দাবির প্রতি আমাদের পূর্ণ সহানুভূতি রয়েছে। পরিস্থিতি অনুধাবন করে সরকার ইতোমধ্যে ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ বলে মনে করি আমরা।
তবে শ্রমিকদের এই আন্দোলনকে ঘিরে যে সহিংসতা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আন্দোলনের কারণে রাজপথ অবরুদ্ধ থাকায় সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা ভীষণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ এবং বিশেষ করে জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া রোগীরা যে অবর্ণনীয় ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, তা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, সাধারণ শ্রমিকদের সরলতার সুযোগ নিয়ে স্বার্থান্বেষী মহল এবং নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা এই আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করেছে। পুলিশের গাড়ি, ফায়ার সার্ভিসের যান এবং মিরপুরে মেট্রোরেলের মতো রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় হামলা প্রমাণ করে, এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রও রয়েছে। শ্রমিকদের ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে দেশকে অস্থিতিশীল করা এবং অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিকে ধ্বংস করার অপচেষ্টা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এ ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র কঠোরভাবে দমন করা অপরিহার্য।
একইসঙ্গে শিল্পের চাকা সচল রাখতে মালিকপক্ষের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-কে আরও সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে কেবল কারখানা বন্ধের হুঁশিয়ারি দিয়ে এই বৃহত্তর সংকটের স্থায়ী সমাধান কখনোই সম্ভব নয় বলে আমরা বিশ্বাস করি। সরকার, মালিক ও শ্রমিকপক্ষের সমন্বয়ে গঠিত মজুরি বোর্ডকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি বাস্তবসম্মত ও সম্মানজনক মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করতে হবে, যা শ্রমিকদের জীবনমান সুরক্ষিত করার পাশাপাশি শিল্পের বৈশ্বিক সক্ষমতাও বজায় রাখবে। একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ পেশাদারি ও ধৈর্যের সঙ্গে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। প্রকৃত অপরাধী ও ইন্ধনদাতাদের সিসিটিভি ফুটেজ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আইনের আওতায় আনতে হবে, তবে খেয়াল রাখতে হবে কোনো নিরীহ শ্রমিক যেন অযথা হয়রানির শিকার না হন। শ্রমিকদেরও মনে রাখতে হবে, কারখানা ও রাষ্ট্রীয় স্থাপনা তাদেরই সম্পদ। এগুলো ধ্বংস হলে দিনশেষে তাদের কর্মসংস্থানই হুমকির মুখে পড়বে। কাজেই যে কোনো রাজনৈতিক প্ররোচনা থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ মুক্ত রেখে নিয়মতান্ত্রিক ও আইনি পথে দাবি আদায়ের চেষ্টা করতে হবে। সবার সম্মিলিত ও আন্তরিক প্রচেষ্টাতেই পোশাকশিল্পের চলমান সংকট নিরসন এবং একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।
