ফের এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি
ভোক্তার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি অযৌক্তিক
Advertisement
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশে আবারও বাড়ানো হয়েছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। একই সঙ্গে বাড়ানো হয়েছে গাড়িতে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও। নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান আর্থিক সংকটের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত অনাকাঙ্ক্ষিত। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক পরিবার রান্নার কাজে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি চাপ পড়বে তাদের দৈনন্দিন ব্যয়ে।
এবারের মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বাড়ার পাশাপাশি মজুত, বোতলজাতকরণ, পরিবহণ, ডিস্ট্রিবিউশন ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বৃদ্ধিকে মূল্য সমন্বয়ের কারণ হিসাবে দেখানো হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, ১২ কেজির সিলিন্ডারে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব পড়েছে ৭৪ টাকা। বাকি ১৪৯ টাকা বেড়েছে বিভিন্ন পর্যায়ের চার্জ ও কমিশন বৃদ্ধির কারণে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির চেয়ে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার ব্যয় বৃদ্ধিই এবার গ্রাহকের ওপর বেশি চাপ তৈরি করেছে। প্রশ্ন হলো, এর যৌক্তিকতা কতটা এবং এর প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা?
বিইআরসির গণশুনানিতে মজুত, বোতলজাতকরণ, ডিস্ট্রিবিউশন ও অন্যান্য খরচ বাড়ানোর বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। কমিশন এসব খাতে নতুন করে ব্যয় নির্ধারণ করেছে। কিন্তু ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে কী ধরনের বাস্তবতা রয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাব কতটা স্বচ্ছ এবং বাড়তি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হবে কি না, সেসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ব্যবসায়ীদের পরিচালন ব্যয় ও ন্যায্য মুনাফার বিষয়টি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে এর অজুহাতে ভোক্তাদের ওপর ইচ্ছামতো ব্যয়ের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগও থাকা উচিত নয়। আরও উদ্বেগের বিষয়, বিইআরসি গত মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করলেও বাজারে ওই দামে গ্যাস পাওয়া যায়নি; ক্রেতাদের ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়েছে। অর্থাৎ সরকারনির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ দিয়ে গ্যাস কিনতে বাধ্য হয়েছেন গ্রাহকরা। তাই প্রশ্ন জাগে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা যখন বাজারে নির্ধারিত দাম কার্যকর করতে পারছে না, তখন নতুন করে দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপানোর যৌক্তিকতা কোথায়?
এলপিজির বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই সরবরাহ সংকট, কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি, মজুতদারি ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের যথাযথ তদন্ত না করে শুধু মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং নতুন করে চার্জ ও কমিশন বাড়ানোর ফলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এলপিজি নিয়ে যারা কারসাজি করছে, তাদের পেছনে কোনো প্রভাবশালী মহলের ইন্ধন রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।
আমরা মনে করি, এলপিজির মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। একই সঙ্গে মজুত, বোতলজাতকরণ, পরিবহণ ও বিপণনের প্রতিটি পর্যায়ের ব্যয় নিরীক্ষা করে যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। বাজারে নির্ধারিত দামে গ্যাস বিক্রি নিশ্চিত করতে নিয়মিত অভিযান, মজুতদারি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং ব্যবসায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ভোক্তাদের স্বার্থ উপেক্ষা করে কোনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার সুযোগ দেওয়া যাবে না।
