জনমিতিক সুবিধা ও কর্মসংস্থান
সুবর্ণ সুযোগ হারাতে বসেছি আমরা
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি অর্জনের পর যে কোনো তরুণের স্বপ্নের ঠিকানা হয় সম্মানজনক ও সুসংগঠিত কোনো পেশা। কিন্তু আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা আজ পুরোপুরি ভিন্ন এক গল্পের কথা বলছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৪৪ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী তরুণ বাধ্য হয়ে যুক্ত হচ্ছেন অনানুষ্ঠানিক কাজে। আর সার্বিকভাবে দেশের প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ নিয়োজিত আছে অনিশ্চিত ও নিরাপত্তাহীন অনানুষ্ঠানিক খাতে। এই পরিসংখ্যান কেবল কর্মসংস্থানের ভয়াবহ সংকট নির্দেশ করে না; বরং তা তরুণদের গভীর হতাশা এবং উচ্চশিক্ষার কাঠামোগত দুর্বলতাকেও সামনে আনে।
বাংলাদেশ বর্তমানে জনমিতিক সুবিধার এক স্বর্ণযুগে অবস্থান করছে। তবে এই সুযোগ চিরস্থায়ী হবে না। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুসারে, ২০৪৫ সালে দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে এবং ২০৫১ সালে বাংলাদেশ প্রবীণপ্রধান দেশে রূপান্তরিত হবে। অর্থাৎ, হাতে সময় রয়েছে মাত্র দুই দশকের কিছু বেশি। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তরুণদের উপযুক্ত দক্ষতা, আধুনিক শিক্ষা ও মানসম্পন্ন কাজের নিশ্চয়তা দিতে না পারলে এই আশীর্বাদ অচিরেই দেশের জন্য বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
এই সংকটের প্রধান কারণ হলো শ্রমবাজার ও শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যকার বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে বিশ্বব্যাপী কাজের ধরন বদলালেও আমাদের শিক্ষাক্রমের সেভাবে আধুনিকায়ন হয়নি। এর ফলে শিক্ষায় বিনিয়োগ হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না এবং হতাশ হয়ে তরুণসমাজ শিক্ষাবিমুখ হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে গ্রাম ও শহরের চিকিৎসাসেবার বৈষম্য জীবনযাত্রার মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে-যেখানে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করলেও সেখানে মাত্র ২০ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী কর্মরত।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ এবং ব্যবসার পরিবেশ সহজ করতে হবে, যাতে আনুষ্ঠানিক খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, কারিগরি ও এআইভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য সর্বজনীন পেনশন ও স্বাস্থ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি রাখতে হবে। শতাব্দীসেরা এই জনসংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলে আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।
