পোশাক খাতে অস্থিরতা
স্বার্থান্বেষী মহলের উসকানি প্রতিরোধ করতে হবে
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প। দেশের রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ এবং বিনিয়োগের বড় একটি অংশ এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। শ্রমিক অসন্তোষ, হামলা-ভাঙচুর এবং অবরোধের মতো ঘটনায় দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়-অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার নেতিবাচক প্রভাব এখন আন্তর্জাতিক বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের ক্রয়াদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোয় চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গতকাল যুগান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১ থেকে ৩ নভেম্বর তিন দিনে তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ১ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে বিজিএমইএ-এর হিসাবে রপ্তানি মূল্য বাবদ ক্ষতি ৮৫৯ কোটি টাকা এবং বিকেএমইএ-এর হিসাবে নিট পোশাক খাতে উৎপাদন ক্ষতি প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। এ বিপুল আর্থিক ক্ষতি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
তবে আর্থিক ক্ষতির চেয়েও বড় আশঙ্কার জায়গা হলো আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া। দেশের কারখানাগুলোয় বারবার অস্থিরতা সৃষ্টি হলে ক্রেতারা বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকবেন, এটাই স্বাভাবিক। ইতোমধ্যে কোনো কোনো বিদেশি ক্রেতা আগামী দুই মাসের ক্রয়াদেশ কমানোর চিন্তা করছেন এবং বাংলাদেশের কিছু ক্রয়াদেশ ভারত, পাকিস্তানসহ প্রতিযোগী দেশগুলোয় স্থানান্তরের তথ্যও রয়েছে। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশের রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
মনে রাখতে হবে, একটি ক্রয়াদেশ হারানো মানে শুধু একটি কারখানার ব্যবসা কমে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রমিকের কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তার বিনিয়োগ, ব্যাংকের ঋণ এবং অসংখ্য সহযোগী শিল্পের অস্তিত্ব। উৎপাদন বন্ধ থাকলে সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণ করা যায় না। তখন বাড়তি ব্যয়ে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হয়, নতুবা মূল্যছাড় কিংবা ক্রয়াদেশ বাতিলের ঝুঁকি তৈরি হয়। একবার কোনো ক্রেতা অন্য দেশে চলে গেলে তাকে ফিরিয়ে আনাও সহজ নয়।
শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং অধিকার নিশ্চিত করা মালিক ও সরকারের দায়িত্ব। শ্রমিকদের দাবিদাওয়া থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। এজন্য সরকার ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। বোর্ডকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদেরও বুঝতে হবে, শিল্পের ক্ষতি করে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব নয়। শিল্প টিকে থাকলেই কর্মসংস্থান ও জীবিকার নিশ্চয়তা থাকবে।
অন্যদিকে শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে যারা কারখানায় হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা সড়ক অবরোধের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে আইন প্রয়োগের নামে প্রকৃত শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার যেন ক্ষুণ্ন না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি রাজনৈতিক ও স্বার্থান্বেষী মহলের উসকানি প্রতিরোধ করতে হবে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি পূরণ, শিল্পের নিরাপত্তা এবং উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই এ সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব। কোনোভাবেই দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া যাবে না। কারণ, পোশাকশিল্পের ক্ষতি মানে শুধু একটি শিল্পের ক্ষতি নয়, তা দেশের অর্থনীতি ও কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর আঘাত।
