টেকনাফের পাহাড়ে বন্দিশালা, অপরাধীদের মূলোৎপাটনের বিকল্প নেই
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
টেকনাফের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় মানব পাচারকারী চক্রের কর্মকাণ্ড দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য যে উদ্বেগজনক, তা বলাই বাহুল্য। শনিবার যুগান্তরের খবরে প্রকাশ, কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গীখালীর দুর্গম পাহাড়ে সম্প্রতি সেনাবাহিনীর এক সফল অভিযানে এমনই এক বন্দিশালা থেকে ৫৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। জানা যায়, হ্নীলার রঙ্গীখালীর পাহাড়ি আস্তানায় কাজের প্রলোভনে ফাঁদে ফেলা মানুষদের লোহার শিকলে বেঁধে নির্যাতন করা হচ্ছিল। পাশাপাশি এদের সাগরপথে পাচারের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। তবে দুঃখজনক হচ্ছে, এ অভিযানে যৌথ বাহিনী ভুক্তভোগীদের উদ্ধারের পাশাপাশি পাঁচ পাচারকারীকে আটক করতে সক্ষম হলেও জিম্মিদের মুক্ত করতে গিয়ে মানব পাচারকারীদের গুলিতে এক সেনাসদস্য শাহাদতবরণ করেন। দেশের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের সুরক্ষায় নিয়োজিত একজন তরতাজা প্রাণের এমন আত্মত্যাগ আমাদের ব্যথিত করলেও এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
এ নৃশংস ঘটনা আবারও নির্মমভাবে স্পষ্ট করে দিয়েছে, টেকনাফের বাহারছড়া, হ্নীলা ও হোয়াইক্যংয়ের পাহাড়গুলো এক শক্তিশালী সশস্ত্র অপরাধ চক্রের স্থায়ী অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। ভুক্তভোগীদের মর্মান্তিক বর্ণনায় উঠে এসেছে, কীভাবে দালালদের লোভনীয় প্রলোভন, নিখুঁত জিম্মিদশা এবং পাহাড়ি সশস্ত্র পাহারা দলের মাধ্যমে নিরীহ মানুষকে ফাঁদে ফেলা হয়। শীত মৌসুম কেন্দ্র করে সমুদ্রপথে অবৈধ অভিবাসনের এ মরিয়াপ্রবণতা নতুন কোনো বিষয় নয়; কিন্তু পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের এমন বেপরোয়া উপস্থিতি ও শক্তির মহড়া স্থানীয় সাধারণ মানুষকে চরম উৎকণ্ঠা ও ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। আমরা মনে করি, অপরাধীদের ভয়ে স্থানীয়দের মুখ বন্ধ রাখা এবং প্রায় নিয়মিতভাবেই পাহাড় থেকে গুলির শব্দ ভেসে আসার মতো ঘটনাগুলো প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার দীর্ঘমেয়াদি নজরদারির ঘাটতিকেই নির্দেশ করে।
এ ভয়াবহ সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে বিচ্ছিন্ন বা দায়সারা কোনো অভিযান দিয়ে সুফল পাওয়া কখনোই সম্ভব হবে না। বরং টেকনাফের প্রতিটি পাহাড়ি আস্তানা এবং অপরাধীদের গোপন আস্তানাগুলো চিরতরে গুঁড়িয়ে দিতে যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে একযোগে কঠোর সাঁড়াশি ও স্থায়ী অভিযান পরিচালনা করতে হবে। স্বীকার করতেই হবে, পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, ডাকাত ও মানব পাচারকারীদের পুরোপুরি নির্মূল না করা পর্যন্ত সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এছাড়া স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে দেশব্যাপী ছড়িয়ে থাকা মানবপাচার চক্রের মূল হোতা ও দালাল নেটওয়ার্কের শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে; বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় যারা এসব অপরাধ পরিচালনা করছে, তাদের কঠোর আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
সাধারণ মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি অপরাধীদের তথ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিঃসংকোচে সহায়তার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণের মাঝে আস্থার সেতুবন্ধ আরও সুদৃঢ় করাও জরুরি। সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা আরও জোরদার করার পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়ে অপরাধের রুটগুলো চিরতরে বন্ধ করতে হবে। সেনাসদস্য তিতাস শেখের মহান আত্মত্যাগ যেন কোনোভাবেই বৃথা না যায়।
