যেভাবে দ্রোহের প্রতীক হয়ে ওঠেন ওসমান হাদি
Advertisement
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নিরাপদ রাজনীতির সুবিধাবাদী পথ বেছে নেননি শরিফ ওসমান বিন হাদি। তিনি এসেছিলেন অপ্রস্তুত এক সময়ে। এ দেশ যখন একজন জানবাজ বিপ্লবীর অপেক্ষায় ছিল। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে শেখা ওসমান হাদি অল্প আয়ু নিয়ে পৃথিবীতে এসে বাংলাদেশের মানুষের কাছে হয়ে উঠেন দ্রোহের প্রতীক। সাহস ও দেশপ্রেমের প্রতীক। ফ্যাসিবাদ ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনবিরোধী কণ্ঠস্বর হাদির আগমন যেন এ বাংলার জমিনে অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। পুরোনো বয়ানের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশি বয়ান তৈরি করতে শুরু করেন সাংস্কৃতিক আন্দোলন। গড়ে তোলেন ইনকিলাব মঞ্চ। জুলাইয়ে দেশমাতৃকার মানুষের মুক্তির মিছিলের অগ্রভাগে থাকা হাদির জীবনবোধ ছিল তীক্ষ্ণ। একেবারে সাদাসিধে জীবনযাপন। ইনসাফের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত হাদি হয়ে উঠেছিলেন তারুণ্যের চোখের মণি। তিনি এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, এমন এক রাষ্ট্রের স্বপ্ন নিয়ে নিজেকে উৎসর্গ করে দিলেন, যেখানে দুর্নীতি থাকবে না। জনপ্রতিনিধি হতে হলে তাকে জনগণের কাছে প্রতিনিয়ত জবাবদিহি করতে হবে।
প্রচলিত রাজনীতির বিপরীত স্রোতে অবস্থান, আগুনঝরা বক্তব্য, দৃঢ়চেতা মনোভাবের কারণে ১৮ কোটি মানুষের কাছে পরিচিত নাম হয়ে ওঠেন হাদি। আজ দেশের পক্ষে কথা বললে কাল কি হবে-সেটি নিয়ে তিনি মোটেও ছিলেন না চিন্তিত।
হাদি সেই মানুষ হতে চাননি-‘৩৩ বছর কেটে গেল কেউ কথা রাখেনি।’ তিনি ৩৩ বছর আয়ু নিয়ে পৃথিবীতে এসে এই দুঃখী বাংলার মানুষের কষ্ট দূর করতে ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় ব্যাকুল ছিলেন। তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক। রাজপথে বুক চিতিয়ে সত্য উচ্চারণের সাহস দেখাতে একটুও বিচলিত হননি। শিক্ষিত, মার্জিত ও স্পষ্টভাষী তরুণ হিসাবে তিনি রাজনীতির প্রথাগত ধারা বদলানোর স্বপ্ন দেখতেন, স্বপ্ন দেখিয়েছেন। ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে জাতীয় নির্বাচন করার ঘোষণাও ছিল দুর্দান্ত সাহসী। ওসমান হাদিকে নিয়ে বলতে গিয়ে দেশের বিশিষ্টজন, শিক্ষাবিদ, আন্দোলনের সঙ্গী ও রাজনৈতিক সহযোদ্ধারা তাকে এভাবেই বিশ্লেষণ করেছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান যুগান্তরকে বলেন, ওসমান হাদি একটি স্বপ্নের নাম। ওই স্বপ্নের মৃত্যু নেই। বিপ্লবীদের মৃত্যু নেই। কারণ বিপ্লবীরা স্বপ্নদ্রষ্টা। স্বদেশবাসী ও বিশ্বমানবের উজ্জ্বল জীবনের স্বপ্ন বাস্তব করে তুলতে তারা জীবন উৎসর্গ করেন। স্বপ্নদ্রষ্টা ওসমান হাদির এটা শুধু প্রস্থান মাত্র। তার কর্ম, স্বদেশ চিন্তা এবং মূল্যবোধ অম্লান হয়ে থাকবে। হাদির প্রাণ বিসর্জন দেশের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক পরিসরে যে ক্ষতি হলো, তা অপূরণীয়। আধিপত্যবাদ ও আগ্রাসনবিরোধী ওসমান হাদির রাজনৈতিক দর্শন দেশবাসীকে আন্দোলিত করেছিল।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি ১২ ডিসেম্বর নির্বাচনি গণসংযোগের জন্য রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় গেলে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে হাদিকে গুলি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার রাতে হাদি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। গতকাল জানাজা শেষে তার লাশ দাফন করা হয়।
ওসমান হাদির আত্মপ্রকাশ হয়েছিল বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তনের মানসে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা জিইয়ে রাখতে তিনি গড়েছেন ইনকিলাব মঞ্চ নামের একটি সংগঠন। ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও কালচারাল ফ্যাসিজমের মোকাবিলায় গড়েছেন ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারও। বাংলাদেশে স্বৈরাচারী প্রথার বিলোপ, জুলাই গণহত্যার বিচার ও ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইনকিলাব মঞ্চের ব্যানারেই জারি ছিল তার কণ্ঠ। হাদি সমালোচনা করতে ছাড়েননি বিএনপি, জামায়াত কিংবা প্রভাবশালী কাউকেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করার সময় থেকে শরিফ ওসমান বিন হাদিকে কাছ থেকে দেখে আসছেন তারই বন্ধু মারুফ হোসাইন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বহু বছর ধরে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের যে নিয়ন্ত্রণ ছিল, বিশেষ করে তাদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে সর্বপ্রথম চ্যালেঞ্জ করেছিলেন ওসমান হাদি। তিনি ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় তার জনপ্রিয়তা অল্পদিনেই আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। এ দেশের সাধারণ জনগণ এবং সেই সঙ্গে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত একটা শ্রেণি যাদের মধ্যে সুশীল সমাজের অনেক প্রতিনিধি রয়েছেন, অনেক ডাক্তার রয়েছেন, অনেক শিক্ষাবিদ রয়েছেন যারা বহু বছর ধরে ওসমান হাদির মতো চিন্তা করে আসছেন। কিন্তু সুযোগের অভাবে, আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী আচরণের কারণে, শেখ হাসিনার ভারত তোষণ নীতির কারণে এই সুশীল বুদ্ধিজীবীরা এতদিন চুপ হয়ে ছিলেন। ওসমান হাদিই সর্বপ্রথম এদের কণ্ঠস্বর হয়ে জেগে উঠেছেন এবং সবাইকে জাগিয়ে দিয়েছেন।
চব্বিশের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরা এলাকায় বসবাসের সুবাধে সেই অঞ্চলেই জড়িয়ে যান আন্দোলনে। হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর জুলাই গণহত্যার দায়ে পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ খুনিদের বিচার ও আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে সোচ্চার হন হাদি। সেই থেকেই রাজনীতিতে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়েছিলেন ওসমান হাদি। ভোটারদের কাছ থেকে তোলা টাকায় জনতার এমপি নির্বাচনের ধারণা ও নিয়মিত সেই টাকার স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ করেও সততার অনন্য নজির হয়েছেন হাদি। দেশের চলমান প্রথার বিপরীতে এসব ব্যতিক্রমী কর্মকাণ্ড হাদিকে যতটা জনপ্রিয় করে তুলেছিল ততটাই ক্ষোভ বাড়িয়েছে শত্রুদের। বিদেশের বিভিন্ন নম্বর থেকে আসতে থাকে হত্যার হুমকি। এতে তিনি ভয় পাননি, দমে যাননি। বরং তিনি দিয়েছেন গুলির সামনে বুক পেতে দেওয়ার ঘোষণা। দিয়েছেন, শত্রুর সঙ্গেও ইনসাফের বার্তা। কিন্তু তিনি ইনসাফ চাইলেও ইনসাফ চায়নি শত্রুরা। যার পরিণাম আততায়ীর বুলেট ঝাঁজরা করেছে ওসমান হাদির মাথা। ওসমান হাদির রেখে যাওয়া কাজ সরকারকে বাস্তবায়ন করতে হবে বলে মনে করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জসিম উদ্দীন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, বিপ্লবী ওসমান হাদি ইনসাফ, ফ্যাসিবাদমুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রাণপুরুষ। আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে একজন অকুতোভয় সৈনিক। দেশের তরুণ প্রজন্ম, রাজনীতিবিদ এবং যারা ক্ষমতার চেয়ারে বসবেন তাদের উচিত হবে হাদির স্বপ্ন বাস্তবায়নে অবশ্যই একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন করা। এই পররাষ্ট্রনীতির মূলভিত্তি হবে জুলাইয়ের স্পিরিট। বর্তমান সরকার বা আগামীতে যারা ক্ষমতায় আসবেন তারা যদি ভারতের কাছে নতজানু নীতি স্বীকার করেন সেটি হাদি এবং আবরারদের আত্মাকে কষ্ট দেবে। তিনি বলেন, হাদির আত্মত্যাগ তখনই অর্থবহ হবে যখন এই অন্তর্বর্তী সরকার একটি ঐতিহাসিক সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। নির্বাচিত সরকার হাদির যে স্বপ্ন দুর্নীতিমুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, ফ্যাসিবাদমুক্ত ইনসাফের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়নের নিবেদিত প্রাণ হবে।
