পে-স্কেল দাবিতে যমুনার সামনে অবস্থান
পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত অর্ধশত
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
পে-স্কেলের দাবিতে শুক্রবার সরকারি কর্মচারীরা যমুনা ঘেরাও করতে গেলে কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয় -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার সামনে অবস্থান নিতে যাওয়া সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে পুলিশের ২ ঘণ্টাব্যাপী ধাওয়া-পালটাধাওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লাঠিপেটার পাশাপাশি পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে। এ ঘটনায় অন্তত অর্ধশত আহত হন। এর মধ্যে আন্দোলনকারী ৩৮ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যমুনা এলাকা, কাকরাইল মসজিদ, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ছয় প্লাটুন সদস্য।
সরেজমিন দেখা যায়, ‘সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ’র ব্যানারে কয়েকশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী শুক্রবার সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হন। হাতে ছিল থালা-বাসন, মুখে স্লোগান। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা ‘ভুখা মিছিল’ নিয়ে যমুনা অভিমুখে রওয়ানা হন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শাহবাগ মোড়ে পৌঁছালে প্রথম পুলিশি বাধার মুখে পড়েন আন্দোলনকারীরা। বেলা ১১টার দিকে ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যান তারা। এরপর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনের ব্যারিকেডও ভেঙে মিন্টো রোডে ঢুকে পড়েন আন্দোলনকারীরা। পুলিশ সেখানে নতুন করে ব্যারিকেড দিলে সেটিও ভেঙে ১৪৪ ধারা অমান্য করে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের সামনে গিয়ে সড়কে বসে পড়েন তারা। শুরু হয় স্লোগান-‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম’, ‘অফিস না রাজপথ, রাজপথ রাজপথ’, ‘অবিলম্বে পে-স্কেল দিতে হবে’, ‘যমুনারে যমুনা, পে-স্কেল ছাড়া যাব না’।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কয়েক দফা আন্দোলনকারীদের সরে যাওয়ার অনুরোধ জানান। তবে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান ছাড়বেন না বলে জানিয়ে দেন তারা। একপর্যায়ে পুলিশ জলকামান থেকে পানি নিক্ষেপ করলে আন্দোলনকারীরা সাময়িকভাবে ছত্রভঙ্গ হন। কিছুক্ষণ পর আবার সংগঠিত হয়ে বসে পড়েন। পরিস্থিতি আরও জটিল হলে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার শুরু করে। টিয়ার শেলের ধোঁয়ায় পুরো এলাকা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। আতঙ্কে ছুটে পালান পথচারী ও আশপাশের লোকজন। একপর্যায়ে পুলিশ লাঠিচার্জে নামে। আন্দোলনকারীদের একটি অংশ হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের দিকে সরে যায়, অন্য অংশটি যমুনার সামনেই অবস্থান ধরে রাখে।
এ সময় ঘটনাস্থলে আসেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার শেখ মোহাম্মদ সাজ্জাত আলী। তিনি আন্দোলনকারীদের সরে যাওয়ার আহ্বান জানান। তবে অনড় থাকেন আন্দোলনকারীরা। দুপুর ১টার দিকে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ পুনরায় লাঠিচার্জ, জলকামান ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেয়। টিয়ার শেলের ধোঁয়ায় পুরো এলাকা অন্ধকার হয়ে আসে। আন্দোলনকারীরা পিছু হটে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ের দিকে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ আবারও বলপ্রয়োগ করে। কয়েক দফা সাউন্ড গ্রেনেডের পর আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে শাহবাগ ও বাংলামোটরের দিকে সরে যান।
ঘটনাস্থলে ডিএমপি কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলী বলেন, এই এলাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ। ব্যারিকেড ভেঙে প্রবেশ করা আইনত অপরাধ। সে কারণেই পুলিশ ব্যবস্থা নিয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানায়, এ ঘটনায় আহত ৩৮ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে নারী কর্মচারীও রয়েছেন। অনেকেই শ্বাসকষ্ট ও চোখে তীব্র জ্বালাপোড়ায় ভুগছেন। আহতদের মধ্যে রয়েছেন-জাকারিয়া (৪৯), জয়দেব (৪০), তন্ময় (৩২), আব্দুল হান্নান (৪৫), আব্দুল আউয়াল (৪০), মালেক (৪০) ও মো. সিকান্দার (৪০)।
আহতদের হাসপাতালে নিয়ে আসা সহকর্মী কালাম হাওলাদার অভিযোগ করে বলেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি নিয়ে আমরা যমুনার দিকে যাচ্ছিলাম। কোনো উসকানি ছাড়াই পুলিশ লাঠিচার্জ, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করেছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, নবম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদন বহু আগেই জমা দেওয়া হলেও সরকার গেজেট প্রকাশে গড়িমসি করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কমিশন গঠিত হলেও বাস্তবায়নের কোনো অগ্রগতি নেই। বারবার আশ্বাস দিয়েও সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় বাধ্য হয়ে তারা কঠোর কর্মসূচিতে নামেন। আন্দোলনকারী শাহাদাৎ হোসেন বলেন, আজ পুলিশ আমাদের ওপর হামলা করেছে। অথচ তারাও এই পে-স্কেলের সুবিধাভোগী হবে। আমরা শুধু নিজেদের জন্য নয়, সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করছি।
কোনো আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার হয়নি-ডিএমপি : শুক্রবার সন্ধ্যায় ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান এক বিজ্ঞপ্তিতে জানান, রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা ও সংলগ্ন এলাকায় যে কোনো ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও ব্যারিকেড ভেঙে প্রবেশের চেষ্টা করা হয়। জনশৃঙ্খলা ও প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে নিয়মতান্ত্রিকভাবে টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়েছে। এ ঘটনায় কয়েকজন পুলিশ সদস্য ও বিক্ষোভকারী আহত হন। এ নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
জামায়াতের উদ্বেগ : কর্মচারীদের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। শুক্রবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে দাবি আদায় করা প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। যৌক্তিক দাবি উত্থাপনের জবাবে বলপ্রয়োগের ঘটনা কোনো সমাধান বয়ে আনবে না। সরকারি কর্মচারীরা রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাদের ন্যায্য দাবিকে সম্মান জানিয়ে দ্রুত তা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সরকারের দায়িত্ব। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সরকারি কর্মচারীদের যৌক্তিক দাবি আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সমাধানের পক্ষে। তিনি শান্তিপূর্ণ উপায়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি সমাধানের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
এহসানুল মাহবুব জুবায়ের সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শন ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে অবিলম্বে আহতদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং সরকারি কর্মচারীদের যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়ারও আহ্বান জানান।
