এখনো চড়া মূল্যে কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের
এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণ করছে ৯ কোম্পানি
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পবিত্র রমজান মাস। রান্নাঘরে সেহরি এবং ইফতারে থাকে ব্যস্ততা। কিন্তু সেই রান্নার গ্যাস এলপিজি (তরলিকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) নিয়ে দুশ্চিন্তায় সবাই। বেশি দামে এলপিজি কিনতে হচ্ছে। এমনিতে রমজানে একটু খরচ বেশি। এর মধ্যে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হচ্ছে এলপিজির দাম। সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন, এলপিজি অপারেটর এবং ডিলারদের হাতে সাধারণ জনগণ জিম্মি। কারণ সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে কোথাও এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। ৯ থেকে ১০টি এলপিজি অপারেটরস বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১২ কেজির এলপিজি দাম থাকার কথা ১ হাজার ৩৪১ টাকা। কিন্তু বাজারে ১৮০০ থেকে ২ হাজার টাকার নিচে কোনো এলপিজিই পাওয়া যায় না। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এলপিজির দাম বেশি নেওয়ার এ অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু যুগান্তরকে বলেছেন, এলপিজির কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে একটি সিন্ডিকেট এমন অভিযোগ সরকার পেয়েছে। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিচ্ছি।
রামপুরা এলাকায় বসবাস করেন আব্দুল করিম। মতিঝিল এলাকার একটি বেসরকারি অফিসে চাকরি করেন তিনি। মোটামুটি ভালো বেতনে চাকরি করলেও সংসার চালাতে বেশ হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। কারণ সব কিছুর দাম বেশি। এর মধ্যে এলপিজির দাম নিয়ে বেশ বিপাকে আছেন তিনি। যুগান্তরকে তিনি বলেন, ১৩০০-১৪০০ টাকার এলপিজি এখন ১৯০০ থেকে ২০০০ হাজার টাকা। গত ৩ মাস ধরে এলপিজির দাম কমছেই না। এভাবে তো চলা যায় না।
এলিফ্যান্ট রোডে কথা হয় ফুটপাতের চা বিক্রেতা মাসুমা খানমের সঙ্গে। তিনি বলেন, আগে ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকায় সিলিন্ডার নিতাম। এখন ১৯০০ টাকার নিচে কোনো সিলিন্ডার পাই না। তিনি যমুনা এলপিজি দেখিয়ে বললেন, দেখেন এটা ১৯০০ টাকা দিয়ে নিয়েছি। বারিধারা কালাচাঁদপুর এলাকার দোকান নান্নু ইলেকট্রনিক্স। দোকানের সামনে ওমেরা এলপিজির সিলিন্ডার সাজানো। দোকানদার জানান, ১২ কেজির সিলিন্ডার দোকান থেকে নিলে ১৮০০ টাকায় দেওয়া যাবে। তবে পৌঁছে দিতে হলে আরও ১০০ টাকা বেশি লাগবে।
বিইআরসি এবং জ্বালানি বিভাগ জানায়, ২৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে এলপিজি আমদানি করা হয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার টন। যদিও মাসে এলপিজির চাহিদা ১ লাখ ৬০ হাজার টনের বেশি।
তেজগাঁও এলাকার তাহের এন্টারপ্রাইজের মালিক আবু তাহের যুগান্তরকে বলেন, তার আটটি এলপিজি কোম্পানির ডিলারশিপ রয়েছে। কোনোভাবেই চাহিদা অনুযায়ী এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না। এলপিজির বোটলিং ফ্যাক্টরিতে গাড়ি পাঠালে কমপক্ষে দুদিন বসে থাকতে হয়। তারপর পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ওমেরার ফ্যাক্টরির সামনে এখনো আমার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। একটা গাড়ি একদিন দাঁড়িয়ে থাকলে কত টাকা দিতে হয়। অথচ সেই অনুযায়ী লাভ করা যায় না। এখন সরকার পুরো ব্যবসায় হাত না দিলে পরিস্থিতি ভালো হবে না। এলপিজিতে ডিলারদের কারসাজির অভিযোগ তিনি অস্বীকার করে বলেন, বাজারে এলপিজির সিলিন্ডার পাওয়া গেলে বিক্রি করতে সমস্যা কোথায়। না পেলে তো সংকট থাকবেই। তিনি বলেন, এলপিজি সংকটের এ সময়ে ওমেরাসহ অনেক কোম্পানির খালি সিলিন্ডারের দামও তিনগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আগে ১২ কেজির একটি খালি সিলিন্ডার বিক্রি হতো ৮০০ টাকায়। সেটি এখন ২ হাজার ৪০০ টাকা করা হয়েছে। এভাবে ২৫ এবং ৪৫ কেজি সিলিন্ডারের দামও বাড়ানো হয়েছে। এখানে দেখার মতো কেউ নেই। রাজধানীর অন্যতম বড় এলপিজির ডিলার আবু তাহের আরও জানান, এলপিজির এ সংকট শিগগিরই কাটবে না। এপ্রিল পর্যন্ত থাকতে পারে।
দেশের এলপিজি অপারেটর কোম্পানির এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, এলপিজি আমদানি এবং বোটলিংয়ের জন্য এখন লাইসেন্স আছে ৫২টি। এর মধ্যে এলপিজি আমদানি করছে ৯ থেকে ১০টি কোম্পানি। এরা হচ্ছে-বিএম এনার্জি, ওমেরা, মেঘনা, যমুনা, পেট্রোমেক্স, আই গ্যাস, টোটাল, ডেলটা ও সেনা এলপিজি। তিনি বলেন, অনেক কোম্পানি ঋণখেলাপি বা বিভিন্ন কারণে এলপিজি আমদানি করতে পারছে না। তাই তারা বাজারে সিলিন্ডারও বিক্রি করতে পারছে না। এ অবস্থায় বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে আমদানি করা ওই ৯-১০ এলপিজি অপারেটরস। জ্বালানি বিভাগ বলছে, প্রতিমাসে দেড় লাখ থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টন এলপিজির চাহিদা আছে। এর মধ্যে ৯৮ শতাংশই অর্থাৎ এলপিজির পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। এখন সরকারি এলপিজি কোম্পানিকে চাঙা করার চেষ্টা করছে সরকার।
এলপিজি অপাটেররা জানান, ইরানের সমস্যার কারণে এখন দুবাই এবং সিঙ্গাপুরে সহজে এলপিজি পাওয়া যায় না। তাই বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা আর্জেন্টিনা এমনকি নরওয়ে থেকে এলপিজি আমদানি করছে। এতে করে জাহাজে খরচ পড়ছে বেশি।
