Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

শাহজালালের পাশেই জ্বালানির মজুত

বিমানবন্দরের পেটে ‘টাইম বোমা’

Advertisement

সাইফ আহমাদ

সাইফ আহমাদ

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বিমানবন্দরের পেটে ‘টাইম বোমা’

Advertisement

অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে দেশের হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। কেপিআইভুক্ত স্পর্শকাতর এ এলাকাজুড়ে পদ্মা অয়েল কোম্পানির জ্বালানি সংরক্ষণ স্থাপনা থাকায় এ ঝুঁকি এখন চরম পর্যায়ে। এসব স্থাপনায় নেই পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা। বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাস্তবায়ন করা হয়নি ‘ফায়ার সেফটি প্ল্যান’। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যানও। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথিপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ছাড়া এত বড় জ্বালানি স্থাপনা পরিচালনা ‘টাইম বোমা’র মতো পরিস্থিতি তৈরি করছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিমানবন্দরসংলগ্ন এ জ্বালানি ডিপো এলাকায় অগ্নিকাণ্ড ঘটলে শুধু পদ্মা অয়েল কোম্পানির অবকাঠামোই নয়, হাজার কোটি টাকার উড়োজাহাজ, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা এবং হাজারো যাত্রীর জীবনও চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে। অভিযোগ উঠেছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অসহযোগিতার কারণে নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। এ নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ সাবেক উইং কমান্ডার এটিএম নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কোনো ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অতি সন্নিকটে এ ধরনের বৃহৎ জ্বালানি সংরক্ষণ স্থাপনা থাকার কথা নয়। যদি থাকেও এর পরিচালনার ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক ফায়ার সেফটি ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় অগ্নিনির্বাপণ প্রযুক্তি এবং সমন্বিত জরুরি প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু শাহজালাল বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকায় এখনো সেই মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিমানবন্দরের পাশে বিপুল পরিমাণ দাহ্য জ্বালানি মজুত থাকায় যে কোনো দুর্ঘটনা মুহূর্তেই ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। একটি বড় অগ্নিকাণ্ড শুধু জ্বালানি ডিপোতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং রানওয়ে, উড়োজাহাজ চলাচল, যাত্রী টার্মিনাল এবং আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে। তাই বিষয়টিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে বেবিচক, বিপিসি ও সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, শাহজালাল বিমানবন্দর এলাকায় জ্বালানি তেল সংরক্ষণের জন্য বেবিচকের কাছ থেকে জমি লিজ নেয় পদ্মা অয়েল। নিয়ম অনুযায়ী লিজ নেওয়া জমিতে নির্মিত স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফায়ার সেফটি প্ল্যান বাস্তবায়ন ছিল বাধ্যতামূলক। তবে বেবিচকের সঙ্গে সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের এক সভায় পদ্মা অয়েলের প্রতিনিধি জানান, ভূমি ব্যবহারের বিষয়ে ইজারা চুক্তি থাকলেও স্থাপনার নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিপিসি থেকে আশানুরূপ সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কয়েক দফায় চেষ্টার পরও ঝুলে আছে সেফটি প্ল্যান।

এদিকে, বিপিসির এমন অপেশাদার আচরণ এবং নিরাপত্তার প্রতি অনীহায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বেবিচকের চেয়ারম্যান। ২৯ মার্চ অনুষ্ঠিত এক সভায় তিনি বিষয়টি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। বিষয়টি সুরাহার জন্য সরাসরি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বেবিচকের পরিচালককে (ফায়ার) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সূত্রমতে, পদ্মা অয়েলের ডিপোটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের একেবারে দক্ষিণ পাশ ঘেঁষে অবস্থিত। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিমান জ্বালানি এখান থেকে সরবরাহ করা হয়। অথচ সম্ভাব্য বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা সেখানে পর্যাপ্ত নয়। সেখানে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে বিমানবন্দর পরিচালনাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, বিপিসি ও পদ্মা অয়েলের এই অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনে বছরের পর বছর নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না। বিপিসির নিরাপত্তার প্রতি উদাসীনতার বিষয়টি উল্লেখ করে ইতোমধ্যে বেবিচকের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় এত বড় জ্বালানি সংরক্ষণ স্থাপনা থাকা সত্ত্বেও এখনো পূর্ণাঙ্গ ফায়ার সেফটি প্ল্যান বাস্তবায়ন না হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমরা বারবার সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য তাগিদ দিয়েছি। কিন্তু বিপিসির পক্ষ থেকে সহযোগিতা না পাওয়ায় পুরো প্রক্রিয়া ঝুলে আছে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এর প্রভাব শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিমানবন্দর, উড়োজাহাজ, যাত্রী ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোও মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।

এ বিষয়ে কথা বলতে বিপিসির চেয়ারম্যানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পদ্মা অয়েলের কর্মকর্তারা জানান, তারা বিপিসির নির্দেশনার অপেক্ষায় আছেন। অন্যদিকে বেবিচক কর্তৃপক্ষ বলছে, জাতীয় স্বার্থে এবং নিরাপত্তার খাতিরে তারা কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়।

যুগান্তরের হাতে আসা বেবিচকের অভ্যন্তরীণ নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শুধু পদ্মা অয়েলই নয়, কার্গো ভিলেজ এলাকাতে অগ্নিনিরাপত্তায় চরম অবহেলা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। নথিতে উঠে এসেছে, কোটি কোটি টাকার পণ্য সংরক্ষিত থাকা এ কার্গো এলাকায় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ। নিয়ম অনুযায়ী পুরোনো এক্সপোর্ট ও ইমপোর্ট কার্গো এলাকায় বিমানের নিজস্ব ফায়ার ক্রু মোতায়েন থাকার কথা থাকলেও পরিদর্শনে সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি। এছাড়া হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পুরোনো ইমপোর্ট কার্গো এলাকাতেও নেই কোনো স্থায়ী ফায়ার হাইড্রেন্ট ব্যবস্থা। একাধিক দফা পরিদর্শন করেও দায়িত্বপ্রাপ্ত ফায়ার ক্রুর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারেনি বেবিচকের তদন্ত দল। ফলে সামগ্রিকভাবে বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো এখন এক অদৃশ্য ভয়াবহ অগ্নিঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

এদিকে সারা দেশের বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও অগ্নিনির্বাপণ সক্ষমতা নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বেবিচক। অগ্নিকাণ্ডসহ যে কোনো ধরনের নাশকতামূলক তৎপরতা বন্ধে সংস্থার আওতাধীন সব বিমানবন্দর, অফিস, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং আবাসিক কোয়ার্টারে বিশেষ নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ১০ মে বেবিচক এক আদেশে এলাকায় ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই আদেশ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা শাখা প্রধানদের সরাসরি তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সচেতনতামূলক সাইনেজ ও স্টিকার লাগানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অগ্নিঝুঁকি মোকাবিলায় কারিগরি সক্ষমতা যাচাইয়ের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে বেবিচক। আদেশে বলা হয়-স্মোক ডিটেক্টর, ফায়ার অ্যালার্ম এবং ফায়ার এক্সটিংগুইশার বা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের কার্যকারিতা সার্বক্ষণিক নিশ্চিত করতে হবে। ফায়ার হোজ রিল বা পাইপে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে হবে। এছাড়া বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ড রোধে নিয়মিত লাইন ও ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী পরীক্ষা করার নির্দেশও দেওয়া হয়। যে কোনো ধরনের নাশকতা প্রতিরোধে সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে অফিস সময়ের পরও যেন নিরাপত্তা ব্যবস্থা শিথিল না হয় তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে প্রতিটি স্থাপনার দৃশ্যমান স্থানে নিকটস্থ ফায়ার স্টেশনের হটলাইন নম্বর প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

পায়ুপথে আমিরাত থেকে বয়ে আনল ৩ সোনার ডিম

পায়ুপথে আমিরাত থেকে বয়ে আনল ৩ সোনার ডিম

বিমানবন্দরে ‘ফায়ার-২০২৬’ জরুরি মহড়া

বিমানবন্দরে ‘ফায়ার-২০২৬’ জরুরি মহড়া

শাহজালালে জমজমের পানি নিয়ে তুলকালাম, নেপথ্যে কী

শাহজালালে জমজমের পানি নিয়ে তুলকালাম, নেপথ্যে কী

তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আখতারুজ্জামানকে কারাগারে রাখার আবেদন

তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আখতারুজ্জামানকে কারাগারে রাখার আবেদন

শাহজালালে বিমানকর্মীর কাছ থেকে এক কেজি স্বর্ণ উদ্ধার, আটক ২

শাহজালালে বিমানকর্মীর কাছ থেকে এক কেজি স্বর্ণ উদ্ধার, আটক ২

বিমানবন্দরে নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে মারধর, মেজর আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা

বিমানবন্দরে নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে মারধর, মেজর আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা

আরও পড়ুন

টার্গেট ডিসেম্বর রাজনীতি আতঙ্ক ছড়াচ্ছে কারা

আতঙ্ক ছড়াচ্ছে কারা

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নতুন রূপরেখা প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের প্রস্তাব উচ্চকক্ষ থেকে

প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের প্রস্তাব উচ্চকক্ষ থেকে

থাইল্যান্ডে বসে চালাচ্ছেন দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র শেখ পরিবারের ‘ঘনিষ্ঠ’ রাজী ফখরুল এখনো বেপরোয়া

শেখ পরিবারের ‘ঘনিষ্ঠ’ রাজী ফখরুল এখনো বেপরোয়া

হামলার আশঙ্কায় বন্ধ ব্যাংক-ভূমিসেবাসহ বহু ওয়েবসাইট সাইবার সুরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্ন

সাইবার সুরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্ন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম