Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদন

সুশাসনের ঘাটতি ও দলীয় প্রভাব বিএনপির ইশতেহার পূরণে ঝুঁকি

চাঁদাবাজিকে একজন মন্ত্রীর বৈধতা দানের প্রচেষ্টা ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে * ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৭টি আইনে পরিণত করার উদ্যোগ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য * আমলাতন্ত্রের একাংশ সব পরিবর্তন চাইলেও নিজেদের পরিবর্তন চায় না

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সুশাসনের ঘাটতি ও দলীয় প্রভাব বিএনপির ইশতেহার পূরণে ঝুঁকি

ফাইল ছবি

Advertisement

বিএনপি সরকার তার নির্বাচনি ইশতেহারের অঙ্গীকার অনুযায়ী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়সহ খাতভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন শুরু করেছে। তবে মন্ত্রণালয় ও খাতভিত্তিক কার্যক্রমে সুশাসনের ঘাটতি আছে। আছে অনিয়ম-দুর্নীতিবিরোধী কঠোর সুনির্দিষ্ট অবস্থান ও দিকনির্দেশনার ঘাটতি। অব্যবস্থাপনা ও দলীয় প্রভাব অব্যাহত আছে। এছাড়া ঝুঁকি বিশ্লেষণভিত্তিক কর্মকৌশলের অভাব রয়েছে। এসব কার্যত বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের অঙ্গীকার পূরণে অন্তরায় হিসাবে কাজ করার ঝুঁকি তৈরি করছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব পর্যবেক্ষণ ওঠে এসেছে।

রোববার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। গবেষণার শিরোনাম ছিল ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সরকারের ১০০ দিন : সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ’। প্রতিবেদন প্রকাশ করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। উপস্থাপন করেন টিআইবির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো. জুলকারনাইন ও রিসার্চ ফেলো রাজিয়া সুলতানা। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান, গবেষণা সহযোগী মো. সহিদুল ইসলাম প্রমুখ।

প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সরকার গঠনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, মব সংস্কৃতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা ঘোষণা, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিলেও বিভিন্ন হাটবাজার, পরিবহণ খাত, বাসস্ট্যান্ড, ট্রাকস্ট্যান্ড ইত্যাদি ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, চুরি-ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা লক্ষণীয় মাত্রায় বিদ্যমান। এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি চাঁদাবাজিকে একজন মন্ত্রীর বৈধতা দানের প্রচেষ্টা ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সরকার গঠনের ১০০ দিনের মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কমিশন গঠনের জন্য দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, মানবাধিকার সংরক্ষণ ও অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিতকরণে একটি দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছে।

টিআইবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দেওয়া হলেও ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী-সমর্থক, আমলাতন্ত্র, ব্যবসায়ীসহ প্রায় সব পেশাজীবীদের অনেকের মধ্যেই দৃশ্যমান ‘এবার আমাদের পালা’ সংস্কৃতির চর্চা লক্ষণীয়। পুলিশ, প্রশাসন ও সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক, স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় ও গোষ্ঠী বিবেচনায় নিয়োগ-পদায়ন অব্যাহত, যা বিএনপির নির্বাচনি অঙ্গীকারের পরিপন্থি।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্মীয় শক্তির উত্থান ও দেশব্যাপী বহুধর্মী সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ওপর সহিংস ও ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডে ধারাবাহিকতা নির্বাচিত সরকারের আমলেও অব্যাহত রয়েছে বলে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, সর্বশেষ দৃষ্টান্ত ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শাহ আলীর মাজারে এবং কুষ্টিয়ায় একজন পীরের ওপর হামলা হয়েছে, যা মুক্তচিন্তা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও বৈচিত্র্যের সহাবস্থান এবং সহিষ্ণু আচরণের প্রতিবন্ধক, তথা দেশবাসীর জন্য অশনিসংকেত।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৭টি আইনে পরিণত করার উদ্যোগ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য বলে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, জবাবদিহিমূলক সরকার পরিচালনার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলো রহিত করা বা অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য স্থগিত করার মাধ্যমে কার্যত ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের মোটাদাগে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার রক্ষা, দুর্নীতি দমন এবং গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে পেছনে হাঁটার ইঙ্গিত দেয়।

পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করার ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার রক্ষা, দুর্নীতি দমন-সংক্রান্ত আইন সামান্য কিছু সংশোধন করে পাশ করা যেত। কিন্তু সরকার তা বাতিল বা স্থগিত করেছে। অন্যদিকে যেসব আইন নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সরকারের হাতকে শক্তিশালী করবে, এমন অনেক আইন পাশ করা হয়েছে। টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সরকারের ১০০ দিন একদিকে আশাজাগানিয়া ও সম্ভাবনাময়। অন্যদিকে সুশাসন, দুর্নীতি প্রতিরোধ; বিশেষ করে জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা পূরণে সুনির্দিষ্ট পথরেখা বা উদ্যোগের ঘাটতির দিকটি উদ্বেগজনক।

শিক্ষা খাতের সংস্কারের ক্ষেত্রে ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ প্রশাসনিক রদবদলের বিষয়টি তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, যোগ্যতার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনাকে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে উপাচার্য নিয়োগে সার্চ কমিটি পুনর্গঠন, বিদ্যালয়ে পুনরায় ভর্তি ফি বাতিল এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি নীতিমালা প্রণয়নের মতো উদ্যোগকে ‘ইতিবাচক’ বলেছে টিআইবি।

এছাড়া নতুন সরকারের প্রথম দিকে (মার্চ ও এপ্রিল মাসে) দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটার তথ্য দিয়ে প্রতিবেদনের আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ অংশে বলা হয়, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে পুলিশের তৎপরতা বৃদ্ধি পেলেও সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। মার্চ ও এপ্রিল মাসে দেশে মোট ৬০৫টি খুন, ১৯৬টি অপহরণ, ২৯৪টি ছিনতাই এবং ৯০টি ডাকাতির ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া এই সময়ে পুলিশের ওপর ১২৯টি হামলা এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩ হাজার ৪৯৬টি ঘটনা ঘটেছে।

সরকারের সামনে মোটা দাগে দুই ধরনের ঝুঁকি : টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংস্কারের ক্ষেত্রে একটা বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে আমলাতন্ত্র। আমলাতন্ত্রের একাংশ সব পরিবর্তন চাইলেও নিজেদের পরিবর্তন চায় না। এছাড়া সরকারের পেছনে যে শক্তিগুলো আছে, তাদের একাংশ ক্ষমতাকে দেখে নিজেদের সুবিধা অর্জনের লাইসেন্স হিসাবে। ক্ষমতাসীন দলের মধ্যেই এমন শক্তি আছে, যারা দলবাজি, দখলবাজি, চাঁদাবাজিকে বৈধতা দিতে চায়। এর বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাও থাকতে পারে। সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দেশে নতুন ধারার নেতৃত্ব দেখা যাচ্ছে, কিন্তু সেটা নতুন ধারার সরকার কিনা, সেটি দেখার বিষয়। কোনো রাষ্ট্র বা সরকার শুধু সরকারপ্রধান চালান না, অন্য যাদের দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব আছে তারা একই ধারা ধারণ করছেন কিনা-তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। যে অঙ্গীকারগুলো সরকার করেছে, সেগুলো বাস্তবায়নে তাদের সার্বিকভাবে একটা কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এর পাশাপাশি ঝুঁকিগুলো বিশ্লেষণ করতে হবে।

বিচার বিভাগ নিয়ে করা আরেক প্রশ্নের জবাবে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, বিচার বিভাগ সংশ্লিষ্ট তিনটি অধ্যাদেশ ছিল অভূতপূর্ণ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সেসব অধ্যাদেশ বাতিল করা সরকারের অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এমনকি ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশ বাতিল করা যৌক্তিক হয়নি।

সরকারের চ্যালেঞ্জ ও ইতিবাচক দিক মূল্যায়ন করতে গিয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও আইনশৃঙ্খলা সংকটের মতো ‘বিশাল’ চ্যালেঞ্জের মধ্যেই নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট সুবিধা গ্রহণ না করা, রাষ্ট্রীয় প্রটোকল পরিহার এবং মন্ত্রীদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের ঘোষণা সরকার প্রধানের সদিচ্ছার প্রতিফলন। তবে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারের প্রকৃত অঙ্গীকার ধরে রাখতে হলে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্তরের ঝুঁকিগুলো দ্রুত কাটাতে হবে।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

বিএনপি যা প্রতিশ্রুতি দেয়, তা বাস্তবায়ন করে: রিজভী

বিএনপি যা প্রতিশ্রুতি দেয়, তা বাস্তবায়ন করে: রিজভী

হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আব্দুল মঈন খান

হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আব্দুল মঈন খান

‘আ.লীগ একটি অপপ্রচারকারী দল, তাদের সঙ্গে আরেকটি গুপ্ত দল যুক্ত হয়েছে’

‘আ.লীগ একটি অপপ্রচারকারী দল, তাদের সঙ্গে আরেকটি গুপ্ত দল যুক্ত হয়েছে’

প্রধানমন্ত্রীর সফরে উজ্জীবিত বিএনপি

বঞ্চিত রংপুর পেয়েছে গুরুত্ব প্রধানমন্ত্রীর সফরে উজ্জীবিত বিএনপি

ইশরাক ‘পোষ্য কোটায়’ রাজনীতিতে এসেছেন, অভিজ্ঞতা কম: নিলোফার মনি

ইশরাক ‘পোষ্য কোটায়’ রাজনীতিতে এসেছেন, অভিজ্ঞতা কম: নিলোফার মনি

মাথায় গাছের ডাল পড়ে বিএনপি নেতার মৃত্যু

মাথায় গাছের ডাল পড়ে বিএনপি নেতার মৃত্যু

আরও পড়ুন

থার্ড টার্মিনাল চুক্তির চাপে বাংলাদেশ জাপান ছাড়া বিকল্প নেই শর্ত দিচ্ছে ইচ্ছামতো

জাপান ছাড়া বিকল্প নেই শর্ত দিচ্ছে ইচ্ছামতো

বছরে দেড় হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য মধ্যস্বত্বভোগীর থাবা ফুলের বাজারেও

মধ্যস্বত্বভোগীর থাবা ফুলের বাজারেও

উত্তপ্ত সাজেক ভ্যালি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ইউপিডিএফের গোলাগুলি

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ইউপিডিএফের গোলাগুলি

কিং ফাহাদ বিমানবন্দরে হুথির হামলায় নিহত ২

কিং ফাহাদ বিমানবন্দরে হুথির হামলায় নিহত ২

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম