Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযানের প্রস্তুতি

এবার অস্ত্র হাতেই মাঠে নামছে নারকোটিক্স

Advertisement

তোহুর আহমদ

তোহুর আহমদ

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

এবার অস্ত্র হাতেই মাঠে নামছে নারকোটিক্স

Advertisement

সবকিছু ঠিক থাকলে কিছুদিনের মধ্যেই এবার অস্ত্র হাতেই মাঠে নামতে যাচ্ছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (নারকোটিক্স)। ইতোমধ্যে অভিযান সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ পর্ব শেষ হয়েছে। বর্তমানে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে অস্ত্র কেনার প্রক্রিয়া চলছে। অস্ত্র হাতে আসা মাত্র নতুন উদ্যমে অভিযানে সক্রিয় হবেন তারা। তবে এবার শুধু মাদকসেবী কিংবা খুচরা বিক্রেতা নয়, আড়ালে থাকা গডফাদারদেরও ধরা হবে।

তবে যুগান্তরের কাছে বিশ্লেষকরা নানা সংশয় প্রকাশ করে বলছেন, এক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা আরও স্পষ্ট হতে হবে। কেননা, সব সরকারের আমলেই মাদক গডফাদাররা রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়ে থাকে। এমনকি তাদের এমপি বানাতেও দেখেছেন দেশবাসী, যা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে বিদ্যমান মাদক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এমন বাস্তবতায় মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের জন্য নারকোটিক্সকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা বাড়াতে ডগ স্কোয়াড, সাইবার ও অর্থ পাচার ইউনিট, ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবসহ জনবল কাঠামো বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাদক মামলার বিচারে গতি আনতে গঠিত হচ্ছে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফ বৃহস্পতিবার তার কার্যালয়ে যুগান্তরকে বলেন, নারকোটিক্সের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এ জন্য অস্ত্র, সরঞ্জাম, জনবল বৃদ্ধি এবং প্রশিক্ষণসহ নানা ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে অচিরেই এটি মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একটি শক্তিশালী সংস্থায় পরিণত হবে।

এদিকে নারকোটিক্সের সাবেক ও বর্তমানে কর্মরত কয়েকজন সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, সবকিছু ঠিক থাকলেও কাজের কাজ কিছুই হবে না, যদি সর্ষের মধ্যে ভূত থাকে। অর্থাৎ সবার আগে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের দেশকে ভালোবাসতে হবে। কারণ এ সেক্টরে কাঁচা টাকার ছড়াছড়ি। তাই বিপুল পরিমাণ কাঁচা টাকার লোভ অনেকে সামলাতে পারেন না। ফলে এক শ্রেণির দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সহায়তায় মাদকের বিস্তার ঘটছে।

নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে নারকোটিক্সের সাবেক এক মহাপরিচালক যুগান্তরকে বলেন-অস্ত্র, সরঞ্জামসহ প্রয়োজনীয় আধুনিক সব সুবিধা দেওয়ার পরও অভিযানসংশ্লিষ্টরা সঠিক পথে না এলে ফলাফল শূন্য হতে পারে। অবৈধ অর্থ পকেটে ঢোকাবেন না স্বেচ্ছায় এমন প্রতিজ্ঞা না করলে বাইরে থেকে জোর করে কোনোভাবেই ঘুস বন্ধ করা যাবে না।

অস্ত্র হাতে মাঠে : মাদকের বিরুদ্ধে ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান চালাতে গিয়ে নারকোটিক্সের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকে প্রায়শ হামলার শিকার হচ্ছেন। সম্প্রতি রাজধানীর মগবাজারে অভিযানে গিয়ে এক পরিদর্শক গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনায় আহত হন আরও বেশ কয়েকজন। ঝুঁকি বিবেচনায় নারকোটিক্সের জন্য স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্রের অনুমোদন দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পুলিশের সহায়তায় নারকোটিক্সের মাঠপর্যায়ের জনবলকে অস্ত্র চালনাসহ স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইতোমধ্যে সারদা পুলিশ একাডেমিতে অধিদপ্তরের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) থেকে শুরু করে উপপরিচালক পদমর্যাদার প্রায় চারশ কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রশিক্ষণ সমাপ্ত হয়েছে। অস্ত্র হাতে পেলেই নতুন উদ্যমে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।

ডগ স্কোয়াড : সম্প্রতি জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তার বক্তৃতায় নারকোটিক্সের জন্য ডগ স্কোয়াডের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন মাদক পাচার প্রতিরোধে ডগ স্কোয়াডের আলোচনা আরও বেশ কিছুদিন আগের। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে সৌদি আরব গমনকারী কতিপয় বাংলাদেশির কাছ থেকে একাধিক ইয়াবার চালান ধরা পড়ে। এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে ইতোমধ্যে ঢাকায় কয়েক দফা চিঠি দিয়েছে সৌদি আরব।

সূত্র বলছে, সৌদির চিঠির সূত্র ধরে বিমানবন্দর দিয়ে মাদক চোরাচালান প্রতিরোধে কঠোর হচ্ছে সরকার। এক্ষেত্রে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের সব বন্দরে মাদকবিরোধী অভিযানে নারকোটিক্সকে লিড সংস্থা হিসাবে ঘোষণা করা হচ্ছে। মাদকের চালান উদ্ধারে বিশেষায়িত ডগ স্কোয়াড মোতায়েন ছাড়াও কৌশলগত অবস্থানে বসানো হচ্ছে উচ্চ প্রযুক্তির স্ক্যানার।

সাইবার ইউনিট : বর্তমানে অনলাইন প্ল্যাটফরম নানা ধরনের মাদক বেচাকেনার ক্ষেত্র বা হাব হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সাইবার জগতে রীতিমতো বিজ্ঞাপন দিয়ে বিক্রি হচ্ছে মাদক। লেনদেন হচ্ছে ভার্চুয়াল মুদ্রা বা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে। এ কারণে সাইবার মনিটরিংয়ের ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। ইতোমধ্যে নারকোটিক্সে একটি বিশেষায়িত সাইবার ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাইবার ক্রাইম সেল নামের প্রস্তাবিত এই বিশেষ ইউনিটের জন্য মোট ৭৭ জনের একটি জনবল কাঠামো চাওয়া হয়েছে।

অর্থ পাচারের তদন্ত : মাদক গডফাদারদের বিরুদ্ধে প্রচলিত মাদক আইনের পাশাপাশি অর্থ পাচার আইনেও মামলা করতে চায় নারকোটিক্স। কিন্তু অর্থ পাচার আইন, তদন্ত এবং অনুসন্ধান সম্পর্কে তাদের নিজস্ব দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) সহায়তায় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মাস্টার ট্রেইনার তৈরি করা হচ্ছে। যাতে তারা মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ দিতে পারেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদক গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে হলে অর্থ পাচার আইনে মামলার কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায় রাজনৈতিক প্রভাবে সেই আব্দুর রহমান বদি ওরফে ইয়াবা বদির মতো গডফাদারদের অনেকেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবেন। ইতোমধ্যে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার আইনে দুই ডজনেরও বেশি মামলা করা হয়েছে। আরও একাধিক মামলা তদন্তাধীন।

গুগলের সঙ্গে চুক্তি : মাদক নিয়ন্ত্রণে ইন্টারনেট সার্চ ইঞ্জিন গুগলের সহায়তা নিতে চায় নারকোটিক্স। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে মহপরিচালকের নেতৃত্বে নারকোটিক্সের দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল গুগলের সঙ্গে বৈঠক করেছে। ২২ অক্টোবর অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে গুগলের ইতিবাচক সাড়া মেলে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, নারী ও শিশু পাচার এবং যৌন হেনস্তার ছবি বা ভিডিও দেখে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সংশ্লিস্ট দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে বিশেষ বার্তা পাঠায় গুগল। একই প্রক্রিয়ায় মাদক ব্যবসা এবং মাদকসেবীদের সম্পর্কেও তারা জাতিসংঘের মাদকবিরোধী সংস্থার (আইএনসিবি) কাছে বার্তা পাঠাবে। আইএনসিবি বার্তা দেবে নারকোটিক্সকে।

নিরাময় কেন্দ্র : বিদ্যমান মাদক আগ্রাসনের মুখে সমাজের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে-খোদ সরকারি একাধিক সংস্থার পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে এমন তথ্য। এ কারণে মাদকবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি মাদকাসক্তদের সমাজের মূল ধারায় ফেরাতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মাদকাসক্তির চিকিৎসায় ঢাকায় কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রসহ চারটি সরকারি এবং প্রায় ৪শটি বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর বাইরে বিভাগীয় পর্যায়ে আরও তিনটি নিরাময় কেন্দ্র স্থাপনের কাজ চলছে। তবে খোদ নারকোটিক্স কর্মকর্তারাই বলছেন বেশির ভাগ নিরাময় কেন্দ্রের সেবা সন্তোষজনক নয়।

ট্রাইব্যুনাল : সুপ্রিমকোর্টের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে বিভিন্ন আদালতে প্রায় ৪ লাখ ৭৪ হাজার মাদক মামলা বিচারাধীন। দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তে ঘাটতি এবং সাক্ষীর অভাবে এমন মামলাজট তৈরি হয়েছে। তাই মাদক মামলার বিচারে পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠনের চিন্তা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে আইন মন্ত্রণালয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে মাদক মামলায় সাজার হার ৫০ শতাংশের বেশি। তবে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার হলে সাজার হার আরও বাড়বে। এছাড়া বিদ্যমান ব্যবস্থায় নারকোটিক্সকে সংশ্লিষ্ট থানায় গিয়ে মামলা রেকর্ড করতে হয়। কিন্তু এতে থানা পুলিশের অসহযোগিতাসহ নানা ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এ অবস্থায় দুদকের মতো নিজেরাই মামলা রেকর্ডের ক্ষমতা চায় নারকোটিক্স।

ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব : নিত্যনতুন মাদক শনাক্ত এবং অভিনব পাচার কৌশল উদ্ঘাটনে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ক্ষেত্রে নারকোটিক্স অনেকটাই পিছিয়ে। এ কারণে বিশেষায়িত সাইবার ইউনিটের পাশাপাশি ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া মাঠপর্যায়ে অভিযানসংক্রান্ত জনবল বাড়াতে নতুন করে প্রায় ৯ হাজার জনবল কাঠামোর একটি প্রস্তাব করা হয়েছে। যা বাস্তবায়ন হলে নারকোটিক্সের বিদ্যমান চিত্র পুরোটাই বদলে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

মাদক নির্মূলে সামাজিক পরিবর্তনও জরুরি: ববি হাজ্জাজ

মাদক নির্মূলে সামাজিক পরিবর্তনও জরুরি: ববি হাজ্জাজ

যেভাবে পালিয়ে গেলেন পিচ্চি রাজা, দেখা গেল সিসিটিভি ফুটেজে

যেভাবে পালিয়ে গেলেন পিচ্চি রাজা, দেখা গেল সিসিটিভি ফুটেজে

মাদক নিয়ে ধরা পড়ছেন চুনোপুঁটিরা, গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে

মাদক নিয়ে ধরা পড়ছেন চুনোপুঁটিরা, গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে

মাদক মামলায় ২ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

মাদক মামলায় ২ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুরের ফুওয়াং ক্লাবে এসআরবি ও এনবিআরের অভিযান

সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুরের ফুওয়াং ক্লাবে এসআরবি ও এনবিআরের অভিযান

মাদক-জুয়ায় যুবকরা জড়াচ্ছে চাঁদাবাজিতে

ঢাকা দক্ষিণ সিটি মাদক-জুয়ায় যুবকরা জড়াচ্ছে চাঁদাবাজিতে

আরও পড়ুন

প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৩৩ হাজার মানুষ দুর্ভোগ জেনেও গন্তব্য ঢাকা

দুর্ভোগ জেনেও গন্তব্য ঢাকা

নন্দনগাছীতে রেলের ৩০ একর ভূমি মাছ চাষে লিজ নিয়ে ভরাট করে দোকান বাণিজ্য

মাছ চাষে লিজ নিয়ে ভরাট করে দোকান বাণিজ্য

শান্তির নোবেল পেলেন গাজা গণহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার পিল্লাই

শান্তির নোবেল পেলেন গাজা গণহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার পিল্লাই

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস আজ চিকিৎসার বাইরে ৯২ শতাংশ

চিকিৎসার বাইরে ৯২ শতাংশ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম