রক্তাক্ত জুলাই
‘পানি পান করাতে করাতেই শহীদ হন মুগ্ধ’
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই, রাজধানীর উত্তরা আজমপুর এলাকায় তখন সংঘর্ষ, টিয়ারগ্যাস ও গুলির শব্দে থমথমে চারপাশ। আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাজপথে অবস্থান করছিলেন। কেউ ক্লান্ত, কেউ তৃষ্ণার্ত, কেউ আহত। ঠিক সেই সময় হাতে পানির কেস নিয়ে আন্দোলনকারীদের মাঝে ছুটে বেড়াচ্ছিলেন এক তরুণ-মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। টিয়ারগ্যাসের ধোঁয়ার মধ্যেও তিনি একের পর এক পানির বোতল তুলে দিচ্ছিলেন আন্দোলনকারীদের হাতে। এরই মধ্যে হঠাৎ কপালে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি শহীদ হন।
মুগ্ধের মৃত্যুর পর পানি বিতরণের সেই ভিডিওচিত্রটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তার বলা কথা ‘পানি লাগবে পানি’- সেই বাক্যই পরবর্তীতে স্লোগানে পরিণত হয়। এই আবেগময় স্লোগান আন্দোলনের মাত্রাকে আরও একধাপ এগিয়ে দেয়।
সেই ভিডিওই হয়ে ওঠে তার শেষ জীবন্ত স্মৃতিগুলোর একটি।
মুগ্ধ শহীদ হওয়ার পরদিন উত্তরা কামারপাড়ার বামনারটেক কবরস্থানে তার দাফন করা হয়। তারা তিন ভাই। বড় ভাই মেরিন ইঞ্জিনিয়ার মীর মাহমুদুর রহমান দীপ্ত এবং মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ ও যমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ। তাদের গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার রামরাইল এলাকায়। বাবা মোস্তাফিজুর রহমান সাবেক সরকারি কর্মকর্তা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, সেদিন আন্দোলনকারীদের মধ্যে পানি ও বিস্কুট বিতরণ করছিলেন মুগ্ধ। হঠাৎ পুলিশের গুলি তার কপালে বিদ্ধ হয়। মুগ্ধর বন্ধু জাকিরুল ইসলাম বলেন, ‘বুলেটটি মুগ্ধর কপালে লাগে এবং মাথার ডান দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। চোখের সামনেই মারা যান মুগ্ধ।’
মুগ্ধর বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমানের কাছে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেওয়া স্মৃতির একটি ১৫ জুলাইয়ের পারিবারিক আলাপ। শহীদ হওয়ার মাত্র তিন দিন আগে পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে গল্প করছিলেন। সেই সময় মুগ্ধ হঠাৎ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে জানতে চেয়েছিলেন, ছাত্রদের দাবি সরকার মানবে কি না। জবাবে বাবা বলেছিলেন, ‘দাবি যৌক্তিক। সরকার আজ হোক বা কাল, মানতে বাধ্য।’ তিনি তখন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, বয়স উপযুক্ত হলে তিনিও মুক্তিযুদ্ধে যেতেন। তখন মুগ্ধ মাকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘আম্মু, শুনছ? আব্বু তো মুক্তিযুদ্ধে যাইত। আমরা যদি তখন থাকতাম, তুমি কি আমাদের যেতে দিতে?’ আজ সেই কথাগুলো মনে করে মুগ্ধর বাবা বলেন, তখন বুঝতে পারেননি ছেলের ভেতরে দেশের জন্য কিছু করার এমন গভীর আকাঙ্ক্ষা কাজ করছিল।
৬৪ জেলা ঘোরার স্বপ্ন, মানুষের জন্য কাজ করার অঙ্গীকার : মুগ্ধর বড় ভাই মেরিন ইঞ্জিনিয়ার মীর মাহমুদুর রহমান দীপ্ত বলেন, মুগ্ধ ও তার যমজ ভাই স্নিগ্ধকে আলাদা করা ছিল কঠিন। দুজনের বন্ধুত্ব, দুষ্টুমি আর একসঙ্গে বেড়ে ওঠার অসংখ্য স্মৃতি আজও পরিবারের কাছে অমূল্য।
তিন ভাই মিলে মোটরসাইকেলে দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে বেড়াতেন। মুগ্ধর স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের ৬৪টি জেলা ঘুরে দেখা। তার বিশ্বাস ছিল, দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে হলে আগে তাদের জীবন, সংস্কৃতি ও বাস্তবতা জানতে হবে।
‘অন্যের বিপদে এগিয়ে যাওয়ার শিক্ষাই পেয়েছিলেন’ : ১৮ জুলাই সকালে উত্তরা এলাকায় হতাহতের খবর ছড়িয়ে পড়লে মুগ্ধ ঘরে বসে থাকেননি। বড় ভাই দীপ্ত বলেন, ছোটবেলা থেকেই তাদের শেখানো হয়েছিল অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়াতে। তাই মুগ্ধও পানি ও বিস্কুট নিয়ে বের হয়েছিলেন। মূলত যমজ ভাই স্নিগ্ধরও যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হাতে পাঁচটি সেলাই থাকায় তিনি যেতে পারেননি।
মুগ্ধ তার পারিবারিক বন্ধু আশিককে সঙ্গে নিয়ে প্রথমে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পৌঁছে দেন। পরে একটি মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টাও করেন। আহতদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ শেষ হওয়ার পর তিনি আন্দোলনকারীদের মধ্যে পানি ও বিস্কুট বিতরণ শুরু করেন। ঠিক তখনই অতর্কিত গুলির মুখে পড়েন।
বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মুগ্ধর মা শাহানা চৌধুরী ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তুলতে চেয়েছেন। তিনি জানান, জুলাই আন্দোলনের সময় আবু সাঈদসহ বিভিন্ন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় মুগ্ধ গভীরভাবে ব্যথিত ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সে এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল। নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালানোর ঘটনাগুলো তাকে আন্দোলনের প্রতি আরও দায়বদ্ধ করে তোলে।
কক্সবাজারে ছিল পরিবার, মাকে সত্যি বলতে পারেননি ভাই : মুগ্ধ নিহত হওয়ার সময় পরিবারের সদস্যরা ঢাকায় ছিলেন না। বড় ভাই দীপ্ত বাবা-মাকে নিয়ে কক্সবাজারে অবস্থান করছিলেন। সেদিনই তার মা জীবনে প্রথমবারের মতো সমুদ্র দেখছিলেন। সন্ধ্যায় মুগ্ধর গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পেলেও সঙ্গে সঙ্গে মাকে কিছু জানাননি। কারণ তার মায়ের হৃদরোগ ছিল।
ঢাকায় ফেরার পুরো পথজুড়ে মা বারবার জানতে চাইছিলেন, মুগ্ধ কোথায় আঘাত পেয়েছে, কেমন আছেন। কিন্তু কেউ স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি। একপর্যায়ে তিনি কান্না করে বলেছিলেন, ‘আমার নামাজি ছেলেটাকে আল্লাহ এভাবে নিয়ে যাবে না।’
যে স্বপ্ন পূরণ হলে শান্তি পাবে শহীদদের আত্মা : পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মুগ্ধ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন স্কাউট গ্রুপের একজন রোভার স্কাউট ও ইউনিট লিডার ছিলেন। ২০১৯ সালে বনানীর এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের সময় উদ্ধারকাজে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ স্কাউটসের ‘ন্যাশনাল সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেন। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগ থেকে স্নাতক শেষ করে ২০২৪ সালে বিইউপিতে এমবিএতে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি।
মুগ্ধর বাবা বলেন, জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া অধিকাংশ তরুণ কোনো রাজনৈতিক দলের নির্দেশে নয়, বরং দেশ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে রাস্তায় নেমেছিলেন। তাদের স্বপ্ন ছিল বৈষম্যহীন, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক একটি বাংলাদেশ।
মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম জানান, মুগ্ধ হত্যা মামলায় ইতোমধ্যে ফরমাল চার্জ জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ গঠনের শুনানি জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে হওয়ার কথা রয়েছে। মামলায় পুলিশ সদস্য ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীসহ ২৮ জনকে আসামি করা হয়েছে এবং কয়েকজন ইতোমধ্যে গ্রেফতার হয়েছেন।
