সংবাদ সম্মেলনে চিফ হুইপ
ভারতের সঙ্গে ১০১ চুক্তি পর্যালোচনা করছে সরকার
Advertisement
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভারতের সঙ্গে বিগত সরকারের করা ১০১টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও চুক্তি বর্তমান সরকার পর্যালোচনা করছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। তিনি বলেছেন, পর্যালোচনার ফলাফল শিগগিরই জানানো হবে। শুক্রবার জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় সরকারদলীয় অন্যান্য হুইপ উপস্থিত ছিলেন।
চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের চুক্তির আওতায় বন্ধু রাষ্ট্রের জাহাজ চলাচল এবং ওই চুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে চিফ হুইপ বলেন, আমরা চুক্তিগুলো, মানে সব-১০১টি এমওইউ নিয়ে আলোচনা করছি এবং সেটার ফল অনতিবিলম্বে আপনারা পাবেন।
এর আগে চট্টগ্রাম বন্দরের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আগের সরকারের সময়ে এমন কিছু ব্যবস্থা ও চুক্তি করা হয়েছিল, যেখানে বাংলাদেশ ও কোনো বন্ধু দেশের দুটি জাহাজ একই সময়ে বন্দরে এলে বন্ধু দেশের জাহাজকে আগে খালাস দেওয়ার মতো অগ্রাধিকার রাখা হয়েছিল। এ ধরনের ব্যবস্থা বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, দেশের স্বার্থবিরোধী এমন অসংখ্য ব্যবস্থা ও চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে বর্তমান সরকার। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বা চুক্তি করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রথম বিবেচনায় রাখা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের বিষয়ে চিফ হুইপ জানান, তৃতীয় অধিবেশনটি ছিল ৯ কার্যদিবসের। এ সময়ে ছয়টি বিল উত্থাপন ও পাশ হয়েছে। বিভিন্ন বিধিতে মোট এক হাজার ৬৭৮টি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নিজে ১৫টি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। সংবিধান অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পরপর সংসদের অধিবেশন বসার ধারাবাহিকতায় তৃতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগামী অধিবেশনও একই ধারায় অনুষ্ঠিত হবে।
সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংক রেজল্যুশন আইনে ১৮(ক) ধারা যুক্ত করা এবং পরে সমালোচনার মুখে তা বাদ দিয়ে বিল পাশের বিষয়েও প্রশ্ন করা হয়। জবাবে চিফ হুইপ বলেন, সব কিছু একসঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায় না। সরকার বাংলাদেশের আর্থিক অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়। এজন্যই ওই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরে কেউ আগ্রহ না দেখানোয় সেটি বাতিল করা হয়েছে।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্য সংখ্যা এবং কমিটির সভাপতির পদে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। জবাবে নূরুল ইসলাম মনি বলেন, অতীতে বিরোধী দল থেকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করার নজির খুব বেশি নেই। তবে সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি হিসাবে সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারের অর্থ ব্যয়ের জবাবদিহির ক্ষেত্রে সরকারি হিসাব কমিটি সংসদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলোর একটি। সব মন্ত্রণালয়সহ সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে এ কমিটির কাছে জবাব দিতে হয়।
চিফ হুইপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত ৩৯টি স্থায়ী কমিটির মধ্যে ২৪টিতে বিরোধী দলের সদস্য রাখা হয়েছে। সংসদে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্বের অনুপাতে হিসাব করলে এ সংখ্যা কিছুটা বেশি। ২২টি কমিটিতে বিরোধী দলের তিনজন করে সদস্য রয়েছেন। অন্য কমিটিগুলোতে রয়েছেন দুজন করে।
তৃতীয় অধিবেশনে পাশ হওয়া ছয়টি বিলের মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনীকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে মা-বাবা জীবদ্দশায় সন্তানকে সম্পত্তি দান বা হস্তান্তর করার পরও ওই সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার পাবেন। এর উদ্দেশ্য বৃদ্ধ মা-বাবাকে সুরক্ষা দেওয়া। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবা সন্তানকে সম্পত্তি দেওয়ার পর তাদের ভরণপোষণ ঠিকমতো হয় না। কেউ কেউ বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে বাধ্য হন। নতুন আইনের মাধ্যমে মা-বাবার জীবদ্দশায় তাদের সম্পত্তির ওপর ভোগের অধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল পাশের প্রসঙ্গও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, বিলগুলো তৈরির আগে বিভিন্ন অংশীজন, আইনজীবী, বিচারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সাংবাদিকদের মতামত নেওয়া হয়েছে। ১৬ জন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গেও আলোচনা করে তাদের পরামর্শ নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, অধ্যাদেশে শাস্তির ক্ষেত্রে যে সীমা ছিল, পাশ হওয়া বিলে তা আরও কঠোর করা হয়েছে। এমনকি মৃত্যুদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে।
বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়েও কথা বলেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। বাংলাদেশ সব প্রতিবেশী রাষ্ট্রসহ বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায় জানিয়ে নূরুল ইসলাম বলেন, যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ বেশি, তাদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের যথাযথ মর্যাদার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হবে।
সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে চিফ হুইপ বলেন, বিগত হাসিনা সরকারের রেখে যাওয়া ঋণের বিপরীতে গত পাঁচ মাসে ২০৫ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। এ অর্থ জনগণের করের টাকা। তাই সরকারি অর্থের অপচয় বন্ধে বর্তমান সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। সরকারি অর্থের একটি টাকাও যাতে অপচয় না হয়, সে চেষ্টা করা হচ্ছে।
দেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিয়ে সরকারের সমালোচনা প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন তিনি। নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে দুই থেকে আড়াই বছর সময় লাগে উল্লেখ করে চিফ হুইপ বলেন, চাইলেই দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ খাতে বিগত সরকারের বিভিন্ন চুক্তি ও দায়মুক্তির সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও কিছু কেন্দ্রকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। এতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। ওই সরকারের করা দায়মুক্তির বিধান বাতিল করা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম নির্ধারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরিবর্তে সরকারকে সরাসরি ক্ষমতা দেওয়ার ব্যবস্থারও সমালোচনা করেন তিনি।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিষয়েও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট বলে দাবি করেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, জুলাই সনদের বিষয়ে সরকারের অবস্থান দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন পর্যন্ত পরিষ্কার। সরকার পুরোটা বাস্তবায়ন করবে। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করা হয়েছে। বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এটি বাস্তবায়নের কথা বলেছেন। তাই সরকার জুলাই সনদ শতভাগ বাস্তবায়ন করবে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে উল্লেখ করে নূরুল ইসলাম বলেন, সংবিধান সংশোধন ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। বিরোধীপক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সংবিধান সংশোধন করা হলে তা সুপ্রিমকোর্টে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু সংস্কার করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতেই হবে।
বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়ন করা হয়েছে। এরপর বিভিন্ন সময়ে এতে সংশোধনী আনা হয়েছে। ভারতেও বহুবার সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে চিফ হুইপ বলেন, সংসদকে দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য। জনগণের অর্থের যথাযথ ব্যবহার, আইন প্রণয়ন, সরকারের জবাবদিহি এবং জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংসদে কার্যকর আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
সম্পত্তি হস্তান্তর বিল নিয়ে বিরোধী দলের বিরোধিতার সমালোচনা করে চিফ হুইপ বলেছেন, বিরোধী দলের সদস্যরা শরিয়া আইনের দোহাই দিয়ে বিলটির বিরোধিতা করেছেন। অথচ তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে শরিয়া আইন চালুর কোনো ঘোষণা ছিল না।
