সর্বজনীন পেনশনে নতুন চমক
‘প্রগতি’ স্কিমে সরকারি কোম্পানির বঞ্চিতরা
নমিনির সুবিধা বেড়ে ৮০ বছর মুনাফা ১১.৭২ শতাংশ * আসছে শরিয়াহভিত্তিক স্কিম
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত ও আকর্ষণীয় করতে একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ। সরকারি মালিকানাধীন যেসব কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা প্রচলিত সরকারি পেনশন সুবিধার আওতায় নেই, তাদের সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রগতি’ স্কিমে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি চালু হচ্ছে শরিয়াহভিত্তিক বা ইসলামিক পেনশন ব্যবস্থা। পেনশনারের মৃত্যুর পর স্বামী বা স্ত্রীর পেনশন পাওয়ার বয়সসীমা ৭৫ থেকে বাড়িয়ে ৮০ বছর করা হয়েছে।
এছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য পেনশন তহবিলে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ মুনাফা দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। তবে বহুল আলোচিত পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর করার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পাঁচ বছর চাঁদা দেওয়ার পর টাকা তুলে কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ, পেনশন তহবিল থেকে ঋণ এবং স্বাস্থ্যবিমা চালুর বিষয়গুলোও পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চতুর্থ সভায় এসব সিদ্ধান্ত ও প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভা শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান।
সরকারি কোম্পানির কর্মীরা ‘প্রগতি’ স্কিমে : বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো, সরকারি মালিকানাধীন বিভিন্ন কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত; কিন্তু সরাসরি সরকারি পেনশন ব্যবস্থার আওতাবহির্ভূত কর্মীদের ‘প্রগতি’ স্কিমে আনার উদ্যোগ। বর্তমানে সর্বজনীন পেনশনের প্রগতি স্কিমটি মূলত বেসরকারি কর্মচারী ও প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত। সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানির এমন কর্মীদের একটি অংশ সরকারি সিভিল কর্মচারীদের মতো রাষ্ট্রীয় পেনশন পান না। তাদের অবসর সুবিধা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের চাকরিবিধি ও নিজস্ব ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। ড. সুরাতুজ্জামান জানান, যেসব সরকারি কোম্পানির কর্মী কোনো পেনশন স্কিমের আওতায় নেই, তাদের প্রগতি স্কিমে আনার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা হবে। তবে কোন কোন প্রতিষ্ঠান এ সুবিধার আওতায় আসবে এবং বাস্তবায়ন পদ্ধতি কী হবে, তা পরবর্তী সময়ে নির্ধারণ করা হবে। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানির পেনশন সুবিধাবঞ্চিত কর্মীদের জন্য অবসরপরবর্তী আর্থিক নিরাপত্তার একটি নতুন পথ তৈরি হবে।
ইসলামিক পেনশনের অনুমোদন : সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় শরিয়াহভিত্তিক বা ইসলামিক ভার্সন চালুর প্রস্তাবও অনুমোদন করেছে পর্ষদ। এ ব্যবস্থার কাঠামো, বিনিয়োগ পদ্ধতি ও পরিচালনব্যবস্থা নির্ধারণে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং স্থানীয় পরামর্শকরা কাজ করছেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় একচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণ ও অন্যান্য কারিগরি কাজ শেষে পৃথক বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে। এরপর শরিয়াহভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা চালু করা হবে। পেনশন কর্তৃপক্ষের হিসাবে তহবিলের বিনিয়োগ, আয়-ব্যয় ও সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে মুনাফার হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
নমিনির সুবিধা বাড়ল : পেনশনার মারা গেলে তার স্বামী বা স্ত্রী যে পেনশন সুবিধা পাবেন, সেটির বয়সসীমাও বাড়ানো হয়েছে। আগে ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত এ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ ছিল। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তা বাড়িয়ে ৮০ বছর করা হয়েছে। ড. সুরাতুজ্জামান জানান, পেনশনার নিজে আজীবন পেনশন পাবেন। আর তার স্বামী বা স্ত্রী-অর্থাৎ স্পাউস-৮০ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশন সুবিধা পাবেন। এর ফলে পেনশনারের মৃত্যুর পর নির্ভরশীল স্বামী বা স্ত্রীর দীর্ঘ সময় ধরে আর্থিক সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলো। তবে পেনশন গ্রহণের বয়স ৬০ বছর থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর করার প্রস্তাব নিয়ে বেশ আলোচনা হলেও বৃহস্পতিবারের সভায় এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ড. সুরাতুজ্জামান বলেন, ৫৫ বছর বয়সে পেনশন দেওয়ার বিষয়টি একচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণের ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা হবে। পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে। তিনি জানান, বিভিন্ন দেশে পেনশন শুরুর বয়স ৬২, ৬৬ বা ৬৭ বছর। একইসঙ্গে বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ুও বাড়ছে। ফলে পেনশন ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থায়িত্ব বিবেচনা করেই বয়স নির্ধারণ করতে হবে। অর্থাৎ আপাতত সর্বজনীন পেনশন পাওয়ার বিদ্যমান বয়স ৬০ বছরই থাকছে।
পাঁচ বছর পর টাকা তুলে নেওয়ার প্রস্তাব পর্যালোচনায় : দীর্ঘদিন চাঁদা দেওয়ার পর কোনো বিশেষ প্রয়োজনে একজন অংশগ্রহণকারী যাতে জমা অর্থ নিয়ে কর্মসূচি থেকে বের হতে পারেন, এমন একটি ‘এক্সিট’ ব্যবস্থার প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, পাঁচ বছর চাঁদা দেওয়ার পর নির্দিষ্ট শর্তে জমা অর্থ তুলে নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। বিষয়টি আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। এ ধরনের সুবিধা চালু হলে জরুরি আর্থিক প্রয়োজনে অংশগ্রহণকারীদের জন্য কিছুটা নমনীয়তা তৈরি হতে পারে। তবে একইসঙ্গে পেনশন তহবিলের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব ও অংশগ্রহণকারীর ভবিষ্যৎ পেনশন সুবিধার ওপর এর প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া পেনশন তহবিলে জমা অর্থের বিপরীতে অংশগ্রহণকারীদের ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
প্রবাসীদের যুক্ত করতে নতুন উদ্যোগ : বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মীদের সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রবাস’ স্কিম সম্পর্কে জানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি ব্যবস্থায় বিদেশগামী কর্মীদের ডিপার্চার ওরিয়েন্টেশনের সময় পেনশন সম্পর্কে তথ্য দেওয়া হবে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রচারপত্র সরবরাহের উদ্যোগ রয়েছে। প্রবাসীদের আরও বেশি সংখ্যায় কর্মসূচির আওতায় আনতে সরকারি ব্যবস্থায় বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রবাস স্কিমে অন্তর্ভুক্তির শর্ত রাখার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। সর্বজনীন পেনশনে নতুন নিবন্ধন বাড়াতে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (ইউডিসি), মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রণোদনা বাড়ানো হয়েছে। আগে একজন নতুন অংশগ্রহণকারী নিবন্ধন করালে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ১৫ টাকা দেওয়া হতো। এখন তা বাড়িয়ে ২৫ টাকা করা হয়েছে।
